আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবতার বার্তা দিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) প্রধান মোহন ভাগবত (Mohan Bhagwat)। শনিবার নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়্যারে ‘এক বিশ্ব, এক মানবতা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, হিন্দুত্বের মূল ভাবনার সঙ্গে মানুষের মধ্যে ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ করার কোনও সম্পর্ক নেই। ভারতে বসবাসকারী মুসলিমদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার কথা যাঁরা বলেন, তাঁরা হিন্দুত্বের মূল ধারণাই বোঝেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্যে ভাগবত বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের নিজস্ব আচার, নিয়ম ও উপাসনার পদ্ধতি রয়েছে। মানুষ নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী নির্দিষ্ট ধর্মীয় পথ অনুসরণ করতে পারেন। কিন্তু ধর্মীয় পদ্ধতির পার্থক্যের আড়ালে থাকা মূল সত্য এক এবং সেই জায়গা থেকেই মানবতার ধারণা তৈরি হয়।
ভাগবতের বক্তব্যে উঠে আসে ধর্মীয় বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের প্রসঙ্গও। তাঁর কথায়, বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন পথে ঈশ্বর বা পরম সত্যের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। তাই অন্য কোনও ধর্মের অস্তিত্ব অস্বীকার করা বা তার অনুসারীদের বাদ দেওয়ার চিন্তা হিন্দুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অনুষ্ঠানে তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়, RSS যখন হিন্দুত্ব এবং হিন্দুরাষ্ট্রের কথা বলে, তখন ভারতে বসবাসকারী মুসলিমদের অবস্থান কী? জবাবে ভাগবত স্পষ্ট করে বলেন, নিজেকে হিন্দু মনে করলে মানুষের মধ্যে মৌলিক কোনও বিভেদ নেই—এই বিশ্বাসও গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভারতে মুসলিমদের তাড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে যাঁরা সওয়াল করেন, তাঁদের সঙ্গে হিন্দুত্বের মূল দর্শনের সম্পর্ক নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মানবিক মর্যাদা ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করা যায় না।
নিজেদের সংগঠনের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে RSS প্রধান দাবি করেন, সংঘের কাজের অন্যতম ভিত্তি সেবা ও জনকল্যাণ। তাঁর কথায়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সময় সংঘকর্মীরা সাহায্যপ্রার্থীর ধর্মীয় পরিচয়কে বিবেচনা করেন না।
নিজের বক্তব্যের উদাহরণ হিসেবে একটি বিমান দুর্ঘটনার প্রসঙ্গও টেনে আনেন ভাগবত। তাঁর দাবি, হরিয়ানার দাদারিতে বিমান দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে সংঘের কর্মীরা মুসলিমদেরও সাহায্য করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল—দুর্যোগের সময় মানুষের পরিচয় নয়, মানবিক প্রয়োজনই সবার আগে।
মার্কিন মুলুকে দাঁড়িয়ে ভাগবতের এই বক্তব্য এমন সময়ে সামনে এল, যখন ভারতে হিন্দুত্ব, ধর্মীয় পরিচয় এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র। ফলে নিউ ইয়র্কের ওই মঞ্চ থেকে RSS প্রধানের মন্তব্য ঘিরে স্বাভাবিক ভাবেই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভাগবতের বক্তব্যের মূল সুর ছিল ধর্মীয় বৈচিত্র্যের মধ্যে সহাবস্থান এবং মানবিক মর্যাদার স্বীকৃতি। তাঁর দাবি, বিশ্বাস ও উপাসনার পথ আলাদা হলেও মানুষের মৌলিক পরিচয় ও মানবতার জায়গায় কোনও বিভাজন থাকা উচিত নয়।



