ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের মূল কারণ দুই দেশের সাধারণ মানুষ নন, বরং রাষ্ট্রনীতি, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সীমান্ত—এমনই মত প্রকাশ করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) প্রধান মোহন ভাগবত (Mohan Bhagwat)। তাঁর বক্তব্য, পাকিস্তান বা চিনের সাধারণ নাগরিকদের ভারতের শত্রু হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে সংঘাতের স্থায়ী সমাধান খুঁজতে হবে।
মুম্বইয়ে ‘ইন্ডিয়ান্স ইন্টারন্যাশনাল মুভমেন্ট টু ইউনাইটেড নেশনস’ (IIMUN)-এর ১৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ভাগবত। ভারতীয় দর্শনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কোনও দেশকে দখল করা বা ধ্বংস করার মাধ্যমে সংঘাতের সমাধান সম্ভব নয়। বরং পারস্পরিক সম্প্রীতি ও আত্মীকরণের পথেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে।
আরএসএস প্রধানের মতে, চিরস্থায়ী ঘৃণা বা শত্রুতাকে কোনও সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা যায় না। সংঘাতের কারণে সম্পর্কের মধ্যে ফাটল তৈরি হতে পারে, কিন্তু সেই সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেই তাঁর মত। বরং আলোচনার মাধ্যমে সেই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করা উচিত।
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রসঙ্গে ভাগবত বলেন, পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ মনেপ্রাণে ভারতীয়দের শত্রু—বিষয়টি এমন নয়। একই ভাবে ভারতীয়দেরও পাকিস্তানের সাধারণ নাগরিকদের প্রতি স্বাভাবিক ভাবে শত্রুভাবাপন্ন হওয়ার কথা নয়। তাঁর মতে, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের মতো বিষয়ই দুই দেশের সংঘাতকে জটিল করে তুলেছে।
তবে সংঘাতের সময় নিজের দেশের পাশে থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাও স্পষ্ট করেছেন ভাগবত। তাঁর বক্তব্য, যুদ্ধ বা সংঘাতের পরিস্থিতিতে সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, দেশের মানুষকে সরকার ও সেনাবাহিনীর পাশে থাকা উচিত। জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে এই অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করেন তিনি।
একই সঙ্গে অতীতের সম্পর্ক ভুলে যাওয়ার পক্ষপাতী নন ভাগবত। তাঁর মতে, সংঘাত চিরস্থায়ী হতে পারে না। কোনও না কোনও সময়ে সংঘাতের অবসান ঘটাতেই হবে এবং তার পর সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজন হবে। সেই ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই বর্তমানের শত্রুতা ও ঘৃণাকে স্থায়ী করে তোলা উচিত নয়।
চিনের সঙ্গেও ভারতের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যোগাযোগের কথা তুলে ধরেন RSS প্রধান। তাঁর দাবি, চিনের মানুষ নিজেরাও স্বীকার করেন যে বহু শতাব্দী ধরে ভারতীয় সংস্কৃতি ও জ্ঞান থেকে চিন নানা ভাবে উপকৃত হয়েছে। ফলে বর্তমান রাজনৈতিক বা সীমান্ত সংঘাতের কারণে সেই ঐতিহাসিক যোগাযোগকে পুরোপুরি অস্বীকার করা উচিত নয়।
পাকিস্তানের প্রসঙ্গেও ইতিহাসের উল্লেখ করেন ভাগবত। তাঁর বক্তব্য, প্রায় একশো বছর আগেও বর্তমান পাকিস্তানের ভূখণ্ড অবিভক্ত ভারতের অংশ ছিল। সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতার কথা মনে রেখে ভবিষ্যতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
সব মিলিয়ে, মোহন ভাগবতের বক্তব্যে একদিকে সংঘাতের সময়ে জাতীয় ঐক্য, সরকার ও সেনাবাহিনীর পাশে থাকার বার্তা রয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্থায়ী শত্রুতা তৈরি না করার আহ্বানও রয়েছে। ভারত-পাকিস্তান বা ভারত-চিনের মতো জটিল সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগকেও গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষেই সওয়াল করেছেন RSS প্রধান।



