ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (SIR) ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক–আইনি সংঘাতের কেন্দ্রে উঠে এল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির এজলাসে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একেবারে স্পষ্ট ভাষায় আবেদন জানালেন—“গণতন্ত্রকে রক্ষা করুন।” দীর্ঘ শুনানির পর এই মামলায় নোটিস জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট। পরবর্তী শুনানি হবে আগামী সোমবার। ফলে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা ও আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হল।
দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউয়ের সরকারি বাসভবন থেকে এ দিন সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। আইনজীবীদের গাউনে না থাকলেও গলায় কালো চাদর জড়িয়ে তিনি আদালতে উপস্থিত হন। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে শুরুতে মামলাটি শুনানির অগ্রাধিকার তালিকায় না থাকলেও, তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনের করা মামলার সঙ্গে যুক্ত করে শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রীর মামলাও শোনা হয়।


শুনানির সময় মুখ্যমন্ত্রী নিজে বক্তব্য রাখার অনুমতি চান। প্রথমে পাঁচ মিনিটের সময় চাইলেও প্রধান বিচারপতি তাঁকে ১৫ মিনিট পর্যন্ত বক্তব্য রাখার সুযোগ দেন। আদালতে দাঁড়িয়ে মমতা অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়া একতরফা এবং আইনবিরুদ্ধ। তাঁর বক্তব্য, “ইআরও-দের কোনও ক্ষমতা নেই। বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকে রোল পর্যবেক্ষক আনা হয়েছে। প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যাঁদের অনেকেই এখনও জীবিত।”

মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ তোলেন, মাইক্রো-অবজ়ারভারদের হাতে কার্যত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরাই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিচ্ছেন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার নিয়েও সরব হন তিনি। তাঁর দাবি, গণহারে ফর্ম-৭ জমা পড়ছে, অথচ সংশ্লিষ্ট ভোটারদের প্রকৃত শুনানি হচ্ছে না।
আধার কার্ড প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আগেই আধারকে পরিচয়পত্র হিসাবে গ্রহণ করার নির্দেশ ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা মানা হয়নি। পরিবর্তে অন্য নথি চাওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ার ফলে বহু মানুষের ভোটাধিকার বিপন্ন হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন, “বাংলাকেই কেন টার্গেট করা হল? অসমে কেন এই প্রক্রিয়া হয়নি?”


প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত শুনানির এক পর্যায়ে জানান, আধার সংক্রান্ত বিষয়টি ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে শোনা হয়েছে এবং সেই মামলার রায় ঘোষণা এখনও বাকি রয়েছে। মাইক্রো-অবজ়ারভার এবং যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলির প্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করেন, “আমরা এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেব।”
শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনের কাছে নোটিস জারি করে। মুখ্যমন্ত্রীর বিভিন্ন আবেদন—মাইক্রো-অবজ়ারভারদের ভূমিকা, ফর্ম-৭-এর ব্যবহার, রাজ্যের নথি গ্রহণ, তথ্যগত অসঙ্গতির ক্ষেত্রে ভোটারদের নাম বাদ না দেওয়ার দাবি—সবকিছুই বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে আদালত জানায়। পরবর্তী শুনানি সোমবার নির্ধারিত হয়েছে।
আইন ও রাজনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে এই মামলা শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ নয়, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ। সোমবারের শুনানিতে শীর্ষ আদালত কী অবস্থান নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে গোটা দেশ।







