স্নাতক স্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষা, ভারতের প্রথম রাজ্য হিসেবে ইতিহাস গড়ল বাম শাসিত কেরালা

স্নাতক স্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার ঘোষণা করে নজির গড়ল কেরালা। কেন্দ্রীয় বাজেটের সমালোচনার আবহে রাজ্য বাজেট শিক্ষানীতিতে নতুন দিশা দেখাল।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

দেশে শিক্ষানীতির ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোনো উচিত—তার স্পষ্ট দিশা দেখিয়ে দিল বাম শাসিত কেরালা। যেখানে কেন্দ্রীয় বাজেট পেশের পর শিক্ষা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে কার্যত অস্বস্তিতে পড়তে দেখা গিয়েছে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনকে, ঠিক সেই সময়েই কেরালার শিক্ষা বাজেট দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। স্নাতক স্তর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার ঘোষণা করে এক ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করেছে কেরালা, যা ইতিমধ্যেই শিক্ষাবিদ ও নীতি বিশ্লেষকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

কেন্দ্রীয় বাজেট নিয়ে সাংবাদিক বৈঠকে অর্থমন্ত্রীর কাছে সরাসরি প্রশ্ন ওঠে—যে দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়, সেখানে কেন কেন্দ্রীয় বাজেটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে কোনও স্পষ্ট দিশা নেই? পাশাপাশি মধ্যবিত্তদের জন্য এই বাজেটে কী রয়েছে, সেই প্রশ্নও উঠে আসে। এই দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রীকে প্রথমে অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে হাসতে দেখা যায়। পরে যে ব্যাখ্যা তিনি দেন, তা প্রশ্নের সঙ্গে কার্যত সঙ্গতিহীন বলেই মনে করেন সাংবাদিকদের একাংশ।

এই প্রেক্ষাপটেই দেশজুড়ে নজর ঘুরে যায় সিপিআইএম শাসিত কেরালার দিকে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের রাজ্য বাজেটে অর্থমন্ত্রী কে. এন. বালাগোপাল ঘোষণা করেছেন, কেরালার সরকারি ও সরকারি-সহায়তা প্রাপ্ত কলেজগুলিতে আর্টস ও সায়েন্সের স্নাতক স্তরের পড়াশোনা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হচ্ছে। ভারতে এই প্রথম কোনও রাজ্য দ্বাদশ শ্রেণির গণ্ডি পেরিয়ে স্নাতক স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ঘোষণা করল।

এর আগে কেরালায় বিনামূল্যে শিক্ষার সুবিধা প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে উচ্চশিক্ষা আর্থিকভাবে আরও বেশি মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে বলেই মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।

শুধু বিনামূল্যে পড়াশোনাই নয়, শিক্ষা ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী করতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছে কেরালা সরকার। প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির সমস্ত পড়ুয়ার জন্য দুর্ঘটনা বিমা চালুর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হবে এবং বৃত্তি ও ফেলোশিপের অঙ্ক বৃদ্ধি পাবে, যার আওতায় থাকবেন পিএইচডি গবেষকরাও।

ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে আধুনিক প্রযুক্তি, কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। টেকনো–ইকোনমিক্স ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে একটি গ্লোবাল স্কুল গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও বাজেটে উল্লেখ রয়েছে। কারিগরি শিক্ষার মান উন্নত করতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় স্বশাসন সংস্থাগুলির মধ্যে সংযোগ আরও মজবুত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পথে আবাসন যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য পাবলিক হোস্টেল ব্যবস্থাও চালু করার পরিকল্পনা করেছে রাজ্য সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামো ও প্রশাসনিক শক্তি বাড়াতে শিক্ষা দপ্তরের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ২৫৯ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে, কেরালার বাজেট স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—শিক্ষা কোনও খরচ নয়, বরং ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। বিশেষ করে স্নাতক স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সাহসী, যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন দেশের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও নীতি বিশ্লেষকেরা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহুর্তে। আমাদের ফলো করুন
Google News Google News

সদ্য প্রকাশিত