একুশে জুলাইয়ের শহিদ স্মরণ মঞ্চে বক্তব্য ঘিরে বিতর্কের পর প্রকাশ্যেই তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)-এর শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশানা করলেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee)। তিনি দাবি করেছেন, তিনি এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) প্রতি অনুগত। তবে একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, “দিদি যদি বাস্তব পরিস্থিতি না বোঝেন, তাহলে তিনি নিজের হাতেই দল শেষ করে দেবেন।” তাঁর এই মন্তব্যে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
বুধবার নয়াদিল্লিতে সাংবাদিক বৈঠক করে একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির নিজের ব্যাখ্যা দেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, মঞ্চে বক্তব্য চলাকালীন তাঁকে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে এবং এই ধরনের আচরণ দীর্ঘদিন ধরেই চলছে।
কল্যাণের দাবি, অনুষ্ঠান শুরুর আগে কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তিনি নিজে পরিস্থিতি সামাল দেন এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেন। পরে বক্তাদের তালিকা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি মহুয়া মৈত্রকে বক্তব্য রাখার প্রস্তাব দেন। তালিকায় নাম না থাকায় শেষ পর্যন্ত নিজেই বক্তব্য রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং সে বিষয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বার্তাও পাঠিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
সাংসদের অভিযোগ, তিনি বক্তব্য রাখার সময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) মঞ্চে ওঠার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তাঁর কথায়, “অভিষেক মঞ্চে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এতে বক্তৃতা বন্ধ রাখতে হয়। পরে দিদির অনুমতি নিয়েই আবার বলি। কিন্তু বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই আমাকে জনসমক্ষে অপমানজনকভাবে থামিয়ে দেওয়া হয়।”
এরপরই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি নিশানা করেন কল্যাণ। তিনি বলেন, “অভিষেক যদি এত বড় নেতা হন, তাহলে নির্বাচনের কঠিন সময়ে মাঠে নামলেন না কেন? আমি ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি, কর্মীদের পাশে থেকেছি। শুধু কালীঘাটে বসে থাকলে রাজনীতি হয় না, মানুষের মধ্যে যেতে হয়।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে তাঁর বার্তা আরও স্পষ্ট। কল্যাণ বলেন, “আমি দিদিকে ভালোবাসি বলেই এত বছর রাজনীতি করেছি। জীবন, পেশা, সংসার— অনেক কিছুই বিসর্জন দিয়েছি। কিন্তু যদি সব সিদ্ধান্ত শুধু অভিষেককে ঘিরেই নেওয়া হয়, তাহলে আমাদের মতো কর্মীদের সমস্যা হবে। দিদিকে যুক্তিসঙ্গত হতে হবে। না হলে যে দল তিনি গড়েছেন, সেই দল তাঁর হাতেই শেষ হয়ে যাবে।”
সাংবাদিক বৈঠকে আরজি কর (RG Kar) কাণ্ডের প্রসঙ্গও তোলেন শ্রীরামপুরের সাংসদ। তাঁর দাবি, সেই সময় দলেরই একাংশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরানোর চেষ্টা করেছিল। যদিও কারা এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তিনি কোনও নাম প্রকাশ করেননি। তাঁর দাবি, সেই কঠিন সময়ে তিনি এবং কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh) নেত্রীর পাশে ছিলেন।
বিদ্রোহী সাংসদদের প্রসঙ্গ টেনে কল্যাণ বলেন, ২০২২ সালেই তিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তখন অনেকেই অভিষেকের পাশে থাকলেও কাকলি ঘোষ দস্তিদার (Kakoli Ghosh Dastidar) তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে সুখেন্দুশেখর রায় (Sukhendu Sekhar Ray)-এর নাম উল্লেখ করে দলীয় অভ্যন্তরে তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পনা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন।
অন্যদিকে, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক বিস্ফোরক মন্তব্য নিয়ে কালীঘাট তৃণমূলের প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে। দলের নেতা বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায় (Baishwanar Chattopadhyay) বলেন, “তৃণমূল মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমরা তাঁর নেতৃত্বেই রাজনীতি করি। এর বাইরে আর কিছু বলার নেই।”
একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ বিতর্কের পর কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রকাশ্য ক্ষোভ তৃণমূলের অন্দরের টানাপোড়েনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তাঁর মন্তব্যের জেরে আগামী দিনে দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।



