রাজ্য বিজেপিতে বড়সড় সাংগঠনিক রদবদলের পরেই দলের ভিতরে নতুন করে সামনে এসেছে ‘তৃণমূলীকরণ’-এর বিতর্ক। পুরভোটের আগে মহিলা, যুব, ওবিসি মোর্চা থেকে শুরু করে সাংগঠনিক জেলার নেতৃত্বে একাধিক পরিবর্তন হয়েছে। এরই মধ্যে পানিহাটিতে এই প্রসঙ্গে মুখ খুললেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য, বিজেপির তৃণমূলীকরণ সম্ভব নয়, তবে বাইরে থেকে বিজেপির পতাকা হাতে রাস্তায় নামা প্রত্যেককে আটকানোও দলের পক্ষে সম্ভব নয়।
শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করে বলেন, ‘‘বিজেপি বিজেপিতেই থাকবে।’’ তাঁর যুক্তি, যে দল ২ থেকে ৩০৩-এ পৌঁছেছে এবং ২০টির বেশি রাজ্যে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে, সেই দলের তৃণমূলীকরণ সম্ভব নয়। তাঁর কথায়, শ্যামাপ্রসাদের মাটিতে ৭০ বছরেরও বেশি সময় পর শ্যামাপ্রসাদের সরকার তৈরি হয়েছে।
‘কিছু লোক বিজেপির পতাকা নিয়ে রাস্তায় নেমেছে’
তাহলে ‘সবটা আটকানো সম্ভব নয়’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি? শমীকের ব্যাখ্যা, ভোটের ফল প্রকাশের পর কিছু মানুষ বিজেপির পতাকা হাতে রাস্তায় নেমেছেন। তাঁদের প্রত্যেককে আটকানো দলের পক্ষে সম্ভব নয়।
তবে এই ঘটনাকে তিনি বিজেপিতে আনুষ্ঠানিক যোগদান হিসেবে মানতে নারাজ। শমীকের বক্তব্য, ‘‘বিজেপিতে কোনও যোগদান হয়নি।’’ একইসঙ্গে কিছু মানুষ নিজেকে ‘স্বঘোষিত কাউন্সিলর’ মনে করছেন বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, এঁরা বিজেপিতে থাকবেন না।
অর্থাৎ শমীকের বক্তব্যে দু’টি বিষয় আলাদা। একদিকে বিজেপির সংগঠনে নতুন করে যোগদান বা দলীয় পরিচয় পাওয়ার বিষয়টি, অন্যদিকে বিজেপির পতাকা হাতে প্রকাশ্যে আসা ব্যক্তিদের উপস্থিতি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ঘটনাটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার বার্তা
পানিহাটির বক্তব্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধেও আক্রমণাত্মক সুর শোনা যায় শমীকের কথায়। তাঁর দাবি, বিজেপি চাইলে তৃণমূলের ‘ভাষায়’ জবাব দিতে পারত, কিন্তু দল সেই পথে হাঁটেনি।
শমীক বলেন, ২০২১ সালের ২ মে-র পরের পরিস্থিতির কথা তাঁরা মনে করতে পারতেন। কিন্তু বিজেপি সেই পথে না গিয়ে রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায় বলে তাঁর বক্তব্য।
যাঁদের বিরুদ্ধে লুট বা সরকারি ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। এখানে ওই অভিযোগগুলি শমীক ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক বক্তব্য—এগুলিকে স্বতন্ত্রভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
নেতা-কর্মীদের আচরণ নিয়েও সতর্ক শমীক
শুধু দলবদল বা সংগঠনের চরিত্র নিয়েই নয়, ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির নেতা-কর্মীদের আচরণ নিয়েও সতর্ক করেছেন রাজ্য সভাপতি। শুক্রবার সল্টলেকের বিজেপি দফতরে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায়ের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এই বার্তা দেন।
শমীকের বক্তব্য, রাজ্যের মানুষ বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছেন। কিন্তু দলের নেতা-কর্মীদের ব্যবহার, কথাবার্তা বা শব্দচয়ন দেখে যদি মানুষের মনে হয় তাঁরা সেবা করতে নয়, শাসন করতে এসেছেন, তাহলে বিজেপি নিজেদের আদর্শ ও ভাবধারা থেকেই দূরে সরে যাবে।
অনুষ্ঠানে শমীক ভট্টাচার্যের পাশাপাশি অমিতাভ চক্রবর্তী, লকেট চট্টোপাধ্যায়, দেবজিৎ সরকার, শশী অগ্নিহোত্রী-সহ দলের অন্যান্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
রাজ্য বিজেপির সাম্প্রতিক সাংগঠনিক রদবদলের প্রেক্ষাপটে শমীকের এই বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে নতুন মুখ নিয়ে সংগঠন সাজানো হচ্ছে, অন্যদিকে বাইরে থেকে আসা বা বিজেপির পতাকা হাতে প্রকাশ্যে সক্রিয় হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে দলীয় পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতার সীমারেখা স্পষ্ট করার চেষ্টা করছেন রাজ্য সভাপতি।



