রাষ্ট্রসংঘে শাহবাজের ভাষণের পরই ভারতের পাল্টা জবাব, ‘যা করছে, তার ফল তাদের ভুগতেই হবে’

রাষ্ট্রসংঘের ৮১তম সাধারণ সভায় শাহবাজ শরিফের বক্তব্যের পর ‘রাইট টু রিপ্লাই’-তে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ তুলল ভারত।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভার মঞ্চে ফের মুখোমুখি ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁর ভাষণে কাশ্মীর, ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন। তার পরেই ‘রাইট টু রিপ্লাই’ প্রয়োগ করে পাল্টা জবাব দিল ভারত।

রাষ্ট্রসংঘে ভারতের পার্মানেন্ট মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি পেটাল গহলৌত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়ার অভিযোগ তোলেন। ভারতের তরফে বলা হয়, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থানের পরিণতি তাদেরই ভুগতে হবে।

শাহবাজের অভিযোগের পর ভারতের পাল্টা বক্তব্য

৮১তম রাষ্ট্রসংঘ সাধারণ সভায় শাহবাজ শরিফ ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে পাকিস্তানের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি ২০২৫ সালের সংঘাতের প্রসঙ্গে পাকিস্তানের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলেন এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সময়োচিত হস্তক্ষেপ’-এর কথাও উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি স্থগিত রাখার ভারতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন তিনি।

শাহবাজের বক্তব্য ছিল, পাকিস্তানের ভাগের সিন্ধু অববাহিকার জল বন্ধ, আটকে দেওয়া বা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার কোনও চেষ্টা হলে ইসলামাবাদ সেটিকে ‘যুদ্ধের কাজ’ হিসেবে দেখবে। সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি এখনও কার্যকর এবং বাধ্যতামূলক বলেও দাবি করেন তিনি।

এর পরেই ভারতের তরফে ‘রাইট টু রিপ্লাই’-তে বক্তব্য রাখেন পেটাল গহলৌত। তিনি কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ সামনে আনেন।

‘সন্ত্রাসবাদের পরিণতি ভুগতে হবে’, বার্তা ভারতের

ভারতের প্রতিনিধি বলেন, পাকিস্তানের আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করা হবে এবং সন্ত্রাসবাদে মদতের পরিণতি পাকিস্তানকেই ভুগতে হবে।

ভারতের প্রতিনিধি আরও অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে বারবার একই বক্তব্য তুলে ধরলেই তা সত্যি হয়ে যায় না। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘falsehoods’, ‘deceit’ এবং ‘duplicity’-র অভিযোগও তোলা হয় ভারতের তরফে।

ভারতের বক্তব্যে উঠে আসে ওসামা বিন লাদেনের প্রসঙ্গও। পেটাল গহলৌত উল্লেখ করেন, ৯/১১ হামলার অন্যতম মূল ষড়যন্ত্রকারী লাদেন পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে দীর্ঘদিন অবস্থান করেছিলেন। ভারতের প্রতিনিধি এই ঘটনাকে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থানের প্রসঙ্গে তুলে ধরেন।

সেনাবাহিনী নিয়েও পাকিস্তানকে নিশানা

গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে শাহবাজ শরিফের বক্তব্যেরও পাল্টা জবাব দেয় ভারত। ভারতের প্রতিনিধি পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে দাবি করেন, দেশটির প্রকৃত ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে অজানা নয়।

এক্ষেত্রে ভারতের বক্তব্য ছিল, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর প্রভাব রয়েছে। তবে এটি ভারতের প্রতিনিধির করা রাজনৈতিক মূল্যায়ন—এটি রাষ্ট্রসংঘের কোনও নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নয়।

কাশ্মীর নিয়েও দুই দেশের অবস্থান মুখোমুখি

জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গে ভারত ফের জানিয়ে দিয়েছে, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অন্যদিকে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রসংঘের বিভিন্ন মঞ্চে কাশ্মীরকে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছে। এবারের সাধারণ সভার ভাষণেও শাহবাজ শরিফ সেই অবস্থান পুনরায় সামনে আনেন।

ফলে রাষ্ট্রসংঘের ৮১তম সাধারণ সভাতেও দুই প্রতিবেশী দেশের পুরনো বিরোধের বিষয়গুলি সামনে চলে আসে। একদিকে পাকিস্তানের কাশ্মীর ও সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে অভিযোগ, অন্যদিকে ভারতের সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত পাল্টা অভিযোগ—দুই দেশের বক্তব্যে ফের স্পষ্ট হয়ে ওঠে মতপার্থক্য।

জয়শঙ্করের সঙ্গেও পাকিস্তানি সাংবাদিকের বাদানুবাদ

রাষ্ট্রসংঘের অধিবেশন চলাকালীন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গেও এক পাকিস্তানি সাংবাদিকের প্রশ্নোত্তর পর্বে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জয়শঙ্কর পাল্টা মন্তব্য করেন, ‘একটি সন্ত্রাসবাদী দেশ’ তাঁকে সেই প্রশ্ন করছে। ভারতীয় প্রতিনিধিরা পরে সাংবাদিককে জানান, তাঁর প্রশ্নের জবাব তিনি পেয়ে গিয়েছেন।

অর্থাৎ রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে ভারত-পাকিস্তানের কূটনৈতিক মতবিরোধের পাশাপাশি প্রকাশ্য বাকযুদ্ধও দেখা গেল। শাহবাজ শরিফের ভাষণের পর ভারতের ‘রাইট টু রিপ্লাই’-তে দেওয়া বক্তব্য সেই সংঘাতকেই আরও প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন