প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) ২৫ বছরের প্রশাসনিক যাত্রা উপলক্ষে বৃহস্পতিবার থেকে দেশজুড়ে শুরু হচ্ছে বিজেপির ‘সেবা সংকল্প অভিযান’। তার আগে বুধবার কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠক করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ (Rajnath Singh) মোদীর সরকারের বিভিন্ন সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) সরকারের প্রথম চার মাসের কাজ নিয়েও প্রশংসা করেন তিনি।
মোদী ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে প্রশাসনিক দায়িত্বে আসেন। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। এই ২৫ বছরের যাত্রাকে সামনে রেখেই বিজেপি দেশজুড়ে ‘সেবা সংকল্প অভিযান’ আয়োজন করছে। জাতীয় স্তরে কর্মসূচিটি ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।
কলকাতার সাংবাদিক বৈঠকে রাজনাথের বক্তব্যের মূল সুর ছিল—এই কর্মসূচিকে শুধু মোদীকে ঘিরে একটি রাজনৈতিক প্রচার হিসেবে দেখলে তার উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ থাকবে। তাঁর কথায়, মোদীর প্রশাসনিক জীবনের সঙ্গে দেশের পরিবর্তনের বিষয়টিকেও সামনে আনা হচ্ছে। মোদীর ২৫ বছরের সরকারি দায়িত্বের যাত্রাকে তিনি এক কথায় ‘সেবা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী দাবি করেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনের শীর্ষ দায়িত্বে থাকার পরেও মোদীর প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদীর কাজের মধ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উপর জোর ছিল।
অর্থনীতির প্রসঙ্গেও মোদী সরকারের নীতির পক্ষে সওয়াল করেন রাজনাথ। তিনি ‘মোদীনমিক্স’ শব্দটি ব্যবহার করে দাবি করেন, বর্তমান অর্থনীতির ভিত তৈরি হয়েছে এমন একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে যেখানে দেশের জনশক্তি ও মেধাশক্তিকে আরও বেশি কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভারতীয় অর্থনীতির বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের প্রকৃত GDP বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ ছিল—সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গেও এই সংখ্যাটি মেলে।
২০১৪ সালের আগের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনাও করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, সেই সময়ে ভারতীয় অর্থনীতিকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রিত ও অদক্ষ বলে বর্ণনা করা হত। বর্তমানে অর্থনীতি আরও সুশৃঙ্খল ভাবে পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। এই বক্তব্যটি রাজনাথের রাজনৈতিক মূল্যায়ন; এটি কোনও স্বাধীন অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে নয়, তাঁর মন্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কলকাতার বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিও উঠে আসে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যে প্রথম বার বিজেপি সরকার গঠিত হয়েছে এবং শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রায় চার মাস পূর্ণ করেছেন। রাজনাথ বলেন, এই সময়ের মধ্যে রাজ্য সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে অন্য রাজ্যেও আলোচনা হচ্ছে।
শুভেন্দু সরকারের প্রশংসা করতে গিয়ে রাজনাথ আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যে রাজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। পাশাপাশি বাংলাকে ভবিষ্যতে একটি বড় শিপবিল্ডিং বা জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
এর আগে আগস্টে রাজনাথ সিংহ ও শুভেন্দু অধিকারী যৌথ ভাবে গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (Garden Reach Shipbuilders & Engineers) এবং যন্ত্র ইন্ডিয়া লিমিটেডের (Yantra India Limited) পাঁচটি সম্প্রসারণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। ওই প্রকল্পগুলিতে প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা জানানো হয়েছিল।
মোদীর ২৫ বছর পূর্তির কর্মসূচির সঙ্গে তাই জাতীয় রাজনীতি এবং বাংলার নতুন প্রশাসনিক পর্ব—দুই বিষয়কেই সামনে রাখছে বিজেপি। রাজ্যে অবশ্য জাতীয় কর্মসূচির সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি ও মহালয়ার কথা মাথায় রেখে পশ্চিমবঙ্গে ‘সেবা সংকল্প অভিযান’ ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে বলে রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।
১৭ সেপ্টেম্বর মোদীর জন্মদিন। ওই দিন থেকেই দেশজুড়ে কর্মসূচির সূচনা হবে। বিজেপির ঘোষিত কর্মসূচির মধ্যে রক্তদান শিবির, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, প্রদর্শনী, সেমিনার এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও বুথ, জেলা ও প্রশাসনিক স্তরে একাধিক কর্মসূচি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কলকাতার সাংবাদিক বৈঠক থেকে রাজনাথের বার্তা ছিল, মোদীর ২৫ বছরের প্রশাসনিক যাত্রাকে কেন্দ্র করে শুধু অতীতের কাজের হিসাব নয়, ‘বিকশিত ভারত’-এর লক্ষ্যও সামনে রাখতে চাইছে বিজেপি। আর বাংলার ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে সদ্য ক্ষমতায় আসা শুভেন্দু সরকারের প্রথম চার মাসের প্রশাসনিক কাজ এবং রাজ্যের শিল্প ও উন্নয়ন সম্ভাবনা।



