তোলাবাজির অভিযোগে দলের ভাবমূর্তি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তার জন্য এবার আরও কড়া অবস্থান নিতে চলেছে বঙ্গ বিজেপি। দলের শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির কাছে জমা পড়া তোলাবাজির অভিযোগগুলি দীর্ঘদিন ফেলে না রেখে দ্রুত তদন্ত শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হবে। বিজেপির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ (RSS)-ও তোলাবাজির বিরুদ্ধে দ্রুত এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছে।
এতদিন তোলাবাজির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই বার্তা দিয়ে এসেছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya), দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh) এবং অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul)-এর মতো নেতারা। কখনও অভিযুক্তদের দল থেকে বহিষ্কারের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, আবার কখনও আইনি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শুধু মৌখিক সতর্কবার্তায় যে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না, দমদম ও দেগঙ্গার সাম্প্রতিক অভিযোগে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
দমদমে স্থানীয় এক প্রোমোটারের কাছ থেকে তোলা চেয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ, উত্তর ২৪ পরগনার দমদমের পিকে গুহ রোডের প্রোমোটার অমরনাথ সিংহের কাছে বেশ কয়েকদিন ধরে ফোন করে টাকা চাওয়া হচ্ছিল। তিনি তোলা দিতে অস্বীকার করার পর সোমবার রাতে তাঁর অফিসে কয়েকজন ঢুকে হামলা ও ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা প্রোমোটারকে বন্দুকের বাট দিয়ে মারধর করে এবং তাঁর অফিসে তাণ্ডব চালায়। ঘটনায় মাথায় আঘাত পান ওই প্রোমোটার। এই ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় কিছু বিজেপি কর্মীর যোগ থাকার অভিযোগ উঠেছে। যদিও অভিযোগের সত্যতা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
দমদমের বিজেপি বিধায়ক অরিজিৎ বক্সী ঘটনার নিন্দা করে জানিয়েছেন, ঘটনায় যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশকে বলা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের ঘটনা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। ফলে স্থানীয় স্তরে ওঠা অভিযোগকে কেন্দ্র করে দলের অন্দরেও চাপ তৈরি হয়েছে।
শুধু দমদম নয়, উত্তর ২৪ পরগনার দেগঙ্গাতেও বিজেপির এক বুথ সভাপতির বিরুদ্ধে এক লক্ষ টাকা তোলা চাওয়ার অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাধিকবার সতর্কবার্তার পরও পরপর এমন অভিযোগ সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তি বেড়েছে বিজেপির অন্দরে।
এই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই শীর্ষ নেতৃত্বের উপলব্ধি, অভিযোগগুলি দ্রুত নিষ্পত্তি না করলে দলের ভাবমূর্তিতে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। সেই কারণেই শৃঙ্খলারক্ষা কমিটিকে তোলাবাজির অভিযোগগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের ফাইল মাসের পর মাস পড়ে থাকবে না—দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তি ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তোলাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার বার্তা এসেছে আরএসএসের তরফেও। সূত্রের খবর, এই বিষয়ে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বকে সংগঠনের পক্ষ থেকে সক্রিয় হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। আরএসএসের রাজ্য প্রচার প্রমুখ জিষ্ণু বসুর বক্তব্য, বাংলায় তোলাবাজির সংস্কৃতি বন্ধ করা জরুরি এবং অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পদক্ষেপ করা উচিত। কারও সঙ্গে কার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, তা না দেখে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষেই সঙ্ঘ।
দলের ভিতর থেকেও এখন একই সুর শোনা যাচ্ছে। শমীক ভট্টাচার্য তোলাবাজির বিরুদ্ধে সরব হওয়ার পর দিলীপ ঘোষ এবং অগ্নিমিত্রা পালও তাঁর অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। মঙ্গলবার সেই সুরে সুর মিলিয়েছেন রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং (Arjun Singh)। তাঁর বক্তব্য, শুধু তোলাবাজদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করলেই হবে না, অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এমনকী অভিযুক্তদের দল থেকে বহিষ্কারের পক্ষেও সওয়াল করেছেন তিনি।
বিজেপির এক প্রবীণ নেতার ব্যাখ্যা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার ফলেই কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দুর্নীতির তকমা স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, বিজেপির ক্ষেত্রেও এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। দলের কোনও সদস্য তোলাবাজির সঙ্গে যুক্ত থাকলে দ্রুত তাঁকে সংগঠন থেকে সরিয়ে না দিলে ভবিষ্যতে দলের পরিচয়ের সঙ্গে তোলাবাজির অভিযোগ জড়িয়ে যেতে পারে।
এই ইস্যুকে অবশ্য রাজনৈতিক আক্রমণের হাতিয়ার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) বিজেপিকে নিশানা করে দাবি করেছেন, মাত্র তিন মাসের মধ্যেই কোটি কোটি টাকা লুট হয়েছে। বিজেপির বিরুদ্ধে ওঠা সাম্প্রতিক তোলাবাজির অভিযোগকে সামনে রেখে শাসকদল তাদের রাজনৈতিক প্রচার আরও জোরদার করছে।
বিজেপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, অভিযোগের বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়া থেকে বাস্তবে শাস্তিমূলক পদক্ষেপে যাওয়া। দমদম ও দেগঙ্গার মতো ঘটনায় দ্রুত তদন্ত এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সাধারণ মানুষের কাছে দলের অবস্থান স্পষ্ট হবে। আর সেই পদক্ষেপে দেরি হলে তোলাবাজির অভিযোগই আগামী দিনে বিজেপির জন্য বড় রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।



