বীরভূমের হাসনের তৃণমূল বিধায়ক কাজল শেখের নিরাপত্তা প্রত্যাহার এবং উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ার বিধায়ক হামিদুল রহমানের বিরুদ্ধে পুরনো মামলা ফের খোলার নির্দেশকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন সংঘাত তৈরি হয়েছে। বিধানসভায় শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজলের সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং হামিদুলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেত্রী বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা—এই দুই ঘটনার পরেই প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলি সামনে এসেছে। বিজেপি সরকারের পদক্ষেপকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে অভিযোগ করেছে তৃণমূল। যদিও বিজেপির দাবি, আইন মেনেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিধানসভা নির্বাচনের পর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে নাম লেখানো দুই বিধায়কের সাম্প্রতিক অবস্থান বদল ঘিরেই এই বিতর্ক। কাজল শেখ জানিয়েছেন, তিনি বরাবরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে রয়েছেন। অন্য দিকে, হামিদুল রহমানও দাবি করেছেন, তিনি তৃণমূলের প্রতীকেই জিতেছেন এবং মমতাকেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বলে মনে করেন। এই পরিস্থিতিতে দুই বিধায়ককে ঘিরে রাজ্য সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।
বুধবার বিধানসভায় কাজল শেখের সঙ্গে শোভনদেবের সাক্ষাতের পর তাঁর নিরাপত্তা প্রত্যাহারের বিষয়টি সামনে আসে। কাজলের দাবি, তাঁর দুই নিরাপত্তারক্ষীকে কলকাতা থেকে সিউড়িতে ফিরে পুলিশ লাইনে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন নিরাপত্তা তুলে নেওয়া হল, তা তিনি জানেন না বলে জানিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কথাও বলেছেন হাসনের বিধায়ক। নিরাপত্তা প্রত্যাহারের কারণ সম্পর্কে পুলিশের তরফে কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অন্য দিকে, বৃহস্পতিবার রায়গঞ্জের সভা থেকে চোপড়ার বিধায়ক হামিদুল রহমানের বিরুদ্ধে পুরনো মামলাগুলির তদন্ত ফের শুরু করার নির্দেশ দেওয়ার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন ও পরবর্তী পঞ্চায়েত ভোটের সময় অত্যাচারের শিকার হয়েছেন বলে যাঁরা অভিযোগ করেছিলেন, তাঁদের নতুন করে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর আহ্বানও জানান তিনি। হামিদুলের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ তুলে দখল হওয়া জমি উদ্ধারের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
হামিদুল অবশ্য শুভেন্দুর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, জমি বা বাগান দখলের অভিযোগের পক্ষে মুখ্যমন্ত্রী কোনও প্রমাণ দেখাতে পারবেন না। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেও দাবি করেছেন চোপড়ার বিধায়ক।
কাজল শেখের নিরাপত্তা প্রত্যাহার এবং হামিদুলের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ—দুটি ঘটনাকে একই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখছে তৃণমূলের মমতা-পন্থী অংশ। তাদের অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করায় দুই বিধায়ককে নিশানা করা হচ্ছে। বিজেপি অবশ্য এই অভিযোগ মানতে নারাজ। দলের বক্তব্য, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্ত হওয়াই স্বাভাবিক।
কাজল শেখের নিরাপত্তা প্রত্যাহার নিয়ে সরব হয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়ানো নেতাদের বেছে বেছে নিশানা করছে বিজেপি সরকার। কাজলের বাড়িতে ভাঙচুর এবং নিরাপত্তা তুলে নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
হামিদুলের বিরুদ্ধে পুরনো মামলা খোলার নির্দেশের পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে অভিষেক চোরবাগানের পুজোমণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর প্রসঙ্গ তোলেন। ওই ঘটনার তদন্তে মুখ্যমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তদন্তকারী বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) এখনও সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেনি। এই অভিযোগের বিষয়ে পৃথকভাবে তদন্তের অগ্রগতি যাচাই করা যায়নি।
এ দিকে, কাজল শেখের বাড়ির সামনে পুলিশি তৎপরতার কথাও জানা গিয়েছে। ভোট-পরবর্তী হিংসা-সহ বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তে নানুরের পাপুড়ি গ্রামে তাঁর ভাইপো ফ্লিপ শেখ ও লয়েড শেখের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাত রাউন্ড গুলি উদ্ধারের দাবি করা হয়েছে। তবে এই ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এমন তথ্য সামনে আসেনি।
বীরভূমের রাজনীতিতে কাজল শেখ ও অনুব্রত মণ্ডলের দীর্ঘদিনের বিরোধও এই পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। অনুব্রত গ্রেফতার হওয়ার পর জেলায় কাজলের প্রভাব বেড়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলে মনে করা হত। পরে অনুব্রত জামিনে ফিরে এলেও জেলা সংগঠনে দুই নেতার সম্পর্ক নিয়ে টানাপড়েন অব্যাহত ছিল। নির্বাচনের পর দু’জনেরই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ঘটনাও রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসে। কাজল অবশ্য শোভনদেবের সঙ্গে সাক্ষাতের পর স্পষ্ট জানিয়েছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই রয়েছেন তিনি।
কাজলের নিরাপত্তা প্রত্যাহার নিয়ে তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিধানসভায় বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় ও মিষ্টিমুখ করা রাজনৈতিক সৌজন্যের মধ্যেই পড়ে। সেই ঘটনার সঙ্গে নিরাপত্তা প্রত্যাহারের কোনও যোগ থাকলে তা উদ্বেগজনক। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলকে দুর্বল করতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরকে ব্যবহার করছে বিজেপি।
তবে ঋতব্রত-ঘনিষ্ঠ বিধায়কদের শিবিরে ভাঙন তৈরি হয়েছে, এমন দাবি মানতে চাননি বিরোধী দলের মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামান। তাঁর বক্তব্য, হামিদুল তাঁদের সঙ্গেই রয়েছেন। কাজল বিধানসভায় এসেছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে কথাও হয়েছে। বিধায়ক হিসেবে নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকলে স্পিকারের কাছে আবেদন জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের বক্তব্য অবশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। দলের প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর দাবি, নির্বাচনের পর মানুষ যে সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে, সেই সরকারের কাজ অপরাধের অভিযোগের তদন্ত করা। রাজনৈতিক আনুগত্য বদলের সঙ্গে প্রশাসনিক পদক্ষেপের কোনও সম্পর্ক নেই বলেই দাবি বিজেপির।



