কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তিন দিনের রাজ্য সফরে এসে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে কাঠগড়ায় তুলতেই, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা কৌশলে বল ঘুরিয়ে দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। শাহের সাংবাদিক বৈঠকের পর বাঁকুড়ার বড়জোড়ার সভা থেকে যেমন পাল্টা আক্রমণ শানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তেমনই দিল্লি রওনা হওয়ার আগে কলকাতা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অভিষেক বিজেপি ও শাহের বিরুদ্ধেই তোপ দাগেন— আর সেই আক্রমণের ‘অস্ত্র’ হিসেবে তুলে ধরেন বিজেপিরই দুই সাংসদের বক্তব্য।
অভিষেকের কটাক্ষ, অনুপ্রবেশ নিয়ে শাহ যা বলছেন, তা নতুন কিছু নয়— “পুরনো চিত্রনাট্য” এবং “ভাঙা ক্যাসেট”। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজ এবং রানাঘাটের সাংসদ জগন্নাথ সরকারের নাম। অভিষেক বলেন, বিজেপির প্রতীকে নির্বাচিত অনন্ত মহারাজ প্রকাশ্যে বলেছেন, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীই নাকি “সবচেয়ে বড় ঘুসপেটিয়া ও পাকিস্তানি।” আবার জগন্নাথ সরকার মন্তব্য করেছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে সীমান্ত থেকে কাঁটাতার তুলে দেওয়া হবে এবং এপার বাংলা-ওপার বাংলার মধ্যে কোনও সীমান্ত থাকবে না। অভিষেকের প্রশ্ন, এই ধরনের বক্তব্যের পরেও কি বিজেপি নেতৃত্ব ওই দুই সাংসদের বিরুদ্ধে কোনও শোকজ বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে?
এর পরেই জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে আরও আক্রমণাত্মক হন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হানা এবং দিল্লিতে লালকেল্লার সামনে বিস্ফোরণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জম্মু ও কাশ্মীরে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে বিএসএফ ও স্থানীয় পুলিশ— দু’টিই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন। একই ভাবে দিল্লি পুলিশের দায়িত্বও কেন্দ্রের হাতে। সেখানে দিনের আলোয় জঙ্গি হানা বা বিস্ফোরণ হলে দায় কার? অভিষেকের বক্তব্য, “এই সব জায়গায় তো তৃণমূল কংগ্রেস সরকার নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে যিনি রয়েছেন, তাঁকেই তো জবাবদিহি করতে হবে।”
তিনি আরও দাবি করেন, গত ১১ বছর ধরে দেশে বিজেপি সরকার চলছে এবং তার মধ্যে ছ’ বছর ধরে অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই সময়ের মধ্যে যদি অনুপ্রবেশ বা নিরাপত্তা ব্যর্থতা হয়ে থাকে, তবে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। অভিষেকের কড়া মন্তব্য, স্বাধীনতার পর দেশের “সবচেয়ে অপদার্থ” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন অমিত শাহ— এই অভিযোগেই সরব হন তিনি।
ভোটের আগে শাহের রাজ্য সফর নিয়েও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তৃণমূল নেতা। ব্যঙ্গের সুরে অভিষেক বলেন, যত খুশি বাংলায় আসুন, রসগোল্লা খান, এখানকার বাতাস দিল্লির তুলনায় পরিষ্কার— প্রাণ ভরে শ্বাস নিন, প্রাণায়াম করুন। তবে শুধু ভোটের আগে নয়, প্রতি মাসেই এসে রাজ্যের মানুষের কথা শুনুন।
শাহের সাংবাদিক বৈঠক ঘিরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম বিভ্রাট নিয়েও বিতর্ক উসকে দেন অভিষেক। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি নেতৃত্ব বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি জানে না। এর আগেও শান্তিনিকেতনকে রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থান বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ বলেছিলেন, এমন উদাহরণ টেনে অভিষেক প্রশ্ন তোলেন— এই দলই কি বাংলার মানুষের জন্য কাজ করতে চাইছে?
সব মিলিয়ে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কেন্দ্র বনাম রাজ্যের রাজনৈতিক তরজা নতুন মাত্রা পেল। শাহের অভিযোগের জবাবে বিজেপিরই নেতাদের বক্তব্য সামনে এনে অভিষেক কার্যত চাপের বল ঠেলে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোর্টেই।



