মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিকে ঘিরে ফের সক্রিয় হচ্ছে বিরোধী শিবির। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নতুন করে ইমপিচমেন্ট মোশন আনার প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু করেছে INDIA জোটের একাধিক দল। এই আবহেই ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশল ঠিক করতে দিল্লিতে বিরোধী নেতাদের বৈঠকের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সূত্রের দাবি, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে ফের বৈঠকে বসতে পারেন INDIA জোটের শীর্ষ নেতারা। যদিও এই নির্দিষ্ট বৈঠকের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। তবে জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর দাবিতে বিরোধীদের মধ্যে সমন্বয় যে বাড়ছে, তা সাম্প্রতিক একাধিক রিপোর্টে স্পষ্ট।
মমতার ফোনের পর রাহুলের উদ্যোগ?
সূত্রের দাবি, ভোটার তালিকা ও ‘ভোটচুরি’ ইস্যুতে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক বিরোধী নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও রয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
মমতা রাহুল গান্ধীকে দিল্লিতে দ্রুত INDIA জোটের বৈঠক ডাকার অনুরোধ জানিয়েছেন বলেও সূত্রের দাবি। সেই সূত্র ধরেই আগামী সপ্তাহে বৈঠকের সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে।
তবে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নতুন ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার বিষয়ে কংগ্রেস ইতিমধ্যেই বিরোধী দলগুলির সঙ্গে সমন্বয় শুরু করেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, লোকসভা ও রাজ্যসভা—দুই কক্ষেই নতুন করে অপসারণের নোটিস দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। প্রস্তাবের খসড়া তৈরির কাজ চলছে এবং আইনি বিশেষজ্ঞদের মতামতও নেওয়া হচ্ছে বলে কংগ্রেস সূত্রে জানানো হয়েছে।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ফের ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব
এটি জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর প্রথম উদ্যোগ নয়। এর আগে বিরোধী সাংসদরা একাধিকবার তাঁর অপসারণের দাবি তুলেছেন। এপ্রিলেও রাজ্যসভায় তাঁর বিরুদ্ধে অপসারণের নোটিস জমা পড়েছিল বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল।
এবার কংগ্রেসের নেতৃত্বে নতুন করে দুই কক্ষেই প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি চলছে। তবে প্রস্তাব আনা এবং তা পাশ করিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরানো—দুটি আলাদা বিষয়।
সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতো একই পদ্ধতি ও একই ধরনের ভিত্তিতে অপসারণ করা যায়। অর্থাৎ সংসদীয় প্রক্রিয়ায় প্রস্তাব গ্রহণের পর নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হয়।
ফলে বিরোধীদের হাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাংসদ রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রস্তাব আনা হলেও সেটি শেষ পর্যন্ত সংসদে পাশ হবে কি না, তা নির্ভর করবে সংসদীয় সমীকরণের উপর।
‘ভোটচুরি’ ইস্যুতে আন্দোলনের পরিকল্পনা
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিরোধীদের ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধন তথা SIR নিয়ে বিতর্ক। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছিলেন।
এই রিপোর্ট সামনে আসার পর বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেসের নেতৃত্বে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার প্রস্তুতিও সেই আবহেই শুরু হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের তরফে এই ধরনের ‘ভিন্নমত’ বা বিভাজনের ব্যাখ্যা খারিজ করা হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, গত এক বছরে SIR-সহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি তিন নির্বাচন কমিশনারের সম্মতিতেই নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধীরা এই ইস্যুকে সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও নিয়ে যেতে চাইছে। বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কর্মসূচি এবং ‘ভোটচুরি’ নিয়ে জনমত গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে কংগ্রেস সূত্রে খবর।
সংসদের ভিতরে-বাইরে কী রণকৌশল?
আগামী দিনে উত্তরপ্রদেশ-সহ একাধিক রাজ্যে নির্বাচন রয়েছে। ফলে ভোটার তালিকা, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং SIR নিয়ে বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রচার আরও জোরদার হতে পারে।
সম্ভাব্য INDIA জোটের বৈঠকে তাই শুধু ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব নয়, সংসদের ভিতরে সরকারের বিরুদ্ধে কীভাবে বিষয়টি তোলা হবে, রাজ্যগুলিতে কী ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হবে এবং বিভিন্ন বিরোধী দলের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে বাড়ানো যায়—সেসব নিয়েও আলোচনা হতে পারে বলে সূত্রের দাবি।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে INDIA জোটের বাইরের কয়েকটি দলও। ফলে বৃহত্তর বিরোধী সমন্বয়ের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
সব মিলিয়ে, জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিরোধীদের রাজনৈতিক তৎপরতা ফের বাড়ছে। কংগ্রেসের উদ্যোগে নতুন ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবের প্রস্তুতি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য দিল্লি বৈঠন—আগামী কয়েক দিনে এই ইস্যুতে রাজনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়তে পারে।



