হালিশহরে পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু, আইও সাসপেন্ড! তৃণমূল কর্মীর স্ত্রীকে চাকরি ও ১০ লক্ষ টাকা সাহায্য শুভেন্দুর

হালিশহরে পুলিশি হেফাজতে বিরজু কেওটের মৃত্যুর ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তের নির্দেশ; আইও সাসপেন্ড, আইসি ক্লোজ এবং মৃতের স্ত্রীকে চাকরির পাশাপাশি ১০ লক্ষ টাকা সাহায্যের ঘোষণা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: হালিশহরে পুলিশি হেফাজতে তৃণমূলকর্মী বিরজু কেওটের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের গাফিলতি স্বীকার করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। সোমবার মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে তিনি তদন্তকারী আধিকারিককে সাসপেন্ড এবং হালিশহর থানার আইসি-কে পুলিশ লাইনে পাঠানোর ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে মৃতের স্ত্রীকে চাকরি, এক বছর মাসিক আর্থিক সহায়তা এবং পরিবারের জন্য ১০ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

মৃত্যুর ঘটনায় নিয়ম মেনে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত হবে বলেও জানিয়েছেন শুভেন্দু। উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক শিল্পী গৌরীসারিয়াকে সেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিত ভাবে মুখ্যমন্ত্রী এবং মৃতের পরিবারকে জানাতে প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

শুভেন্দুর বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর মতো গুরুতর ঘটনায় কোনও গাফিলতি হয়ে থাকলে তা বরদাস্ত করা হবে না। ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী আধিকারিককে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হালিশহর থানার আইসি-কে ‘ক্লোজ’ করে পুলিশ লাইনে পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

মৃতের পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে একাধিক সহায়তার ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, বিরজু কেওটের স্ত্রীকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘অ্যাটেনডেন্ট’ হিসাবে চাকরি দেওয়া হবে। তার আগে এক বছর প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। পরে তাঁকে গ্রুপ-ডি পদে নিয়োগ করা হবে বলে জানান শুভেন্দু।

এর পাশাপাশি বাড়িতে থাকা দুই শিশুর ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, পরিবারের পক্ষ থেকে আলাদা করে আর্থিক সাহায্যের আবেদন না করা হলেও শিশুদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিরজু কেওটের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে অবশ্য এখনও প্রশ্ন রয়েছে। শুভেন্দু জানিয়েছেন, মৃতের স্ত্রী তাঁকে চিঠি দিয়ে স্বামীর উপর শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে আসার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

তোলাবাজি-সহ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে কাঁচরাপাড়া পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর জেনি শর্মা কেওটের স্বামী বিরজুকে গ্রেফতার করেছিল হালিশহর থানার পুলিশ। শুক্রবার তাঁকে আদালতে হাজির করানো হলে বিচারক পাঁচ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন।

এর পর শনিবার তাঁর পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর খবর সামনে আসে। জেনির অভিযোগ, থানার লকআপের ভিতরে পুলিশের মারধরের কারণেই তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ও ময়নাতদন্তের রিপোর্টের উপরই নির্ভর করবে।

ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়েছে। রবিবার মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে কাঁচড়াপাড়ায় গিয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। তাঁর সঙ্গে ছিলেন লোকসভার সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee) এবং রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন (Dola Sen)।

মৃতের বাড়িতে যাওয়ার সময় বিক্ষোভের মুখে পড়ে মমতা রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন। পুলিশ এবং পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা করে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যে লুম্পেনদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে এবং পুলিশ বিজেপিকে সুরক্ষা দিচ্ছে। ঘটনায় মামলা করার কথাও জানান তিনি।

সোমবার তারই জবাব দেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, মমতা পুলিশকে না জানিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। বিজেপির কোনও লোককে তিনি ঘটনাস্থলে দেখেননি বলেও দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, স্থানীয় বিধায়ক খবর পাওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে লোকজনকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।

মমতার মন্তব্যের জবাবে শুভেন্দু বলেন, কোথাও যাওয়ার আগে পুলিশকে জানানো উচিত, যাতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা যায়। একই সঙ্গে গত ১৫ বছরে ৩১৫ জন বিজেপি কর্মী খুন হওয়ার অভিযোগ তুলেও মমতাকে আক্রমণ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বিরুদ্ধ মতের মানুষের পাশে তখন মমতাকে দেখা যায়নি।

হালিশহরের এই ঘটনাকে ঘিরে তাই একদিকে যেমন পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর তদন্ত ও পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের গুরুত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে তীব্র হচ্ছে রাজনৈতিক সংঘাতও। এখন ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তে কী উঠে আসে, তার দিকেই নজর থাকবে। পুলিশের গাফিলতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেটিও এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন