ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা: ‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে বেকহ্যামের প্রতিশোধ, বিশ্বকাপের সবচেয়ে তীব্র ফুটবল দ্বৈরথের গল্প

বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই কখনও শুধু ফুটবল ম্যাচ ছিল না। বিতর্ক, রাজনৈতিক উত্তেজনা, 'হ্যান্ড অব গড', ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড ও প্রতিশোধ—ছয় দশকের ইতিহাসে গড়ে উঠেছে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা: বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা মানেই শুধু দুই শক্তিশালী ফুটবল দলের মুখোমুখি হওয়া নয়। গত ছয় দশকে এই দ্বৈরথ পরিণত হয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত, আবেগঘন এবং ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাগুলির একটিতে। দিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নাটকীয় মুহূর্তে ভরা এই লড়াই নতুন অধ্যায় লিখতে চলেছে আরও একবার।

ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ সারির দুই দেশ মাঠে নামলেও, ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচের গুরুত্ব শুধুমাত্র ফুটবলে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধের পর থেকে এই ম্যাচে রাজনৈতিক আবেগও বারবার জায়গা করে নিয়েছে। যদিও বর্তমান প্রজন্মের ফুটবলারদের কাছে সেটি আর প্রধান বিষয় নয়, ইতিহাস এখনও এই দ্বৈরথের অন্যতম অনুষঙ্গ।

১৯৬৬: বিতর্কের শুরু, বদলে যায় ফুটবলের নিয়ম

বিশ্বকাপে দুই দলের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৬২ সালে। তবে প্রকৃত বিতর্কের জন্ম ১৯৬৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েম্বলিতে।

সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাট্টিনকে লাল কার্ড দেখান রেফারি। সিদ্ধান্ত মেনে নিতে অস্বীকার করে দীর্ঘ সময় মাঠে অবস্থান করেন তিনি। পরে দুই পুলিশকর্মীর সঙ্গে মাঠ ছাড়লেও ক্ষোভ প্রকাশে রানির জন্য রাখা লাল কার্পেটেই বসে পড়েন।

ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ র‍্যামসে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের “Animals” বলে মন্তব্য করেন। ঘটনাটি এতটাই আলোড়ন তোলে যে, ভবিষ্যতে ভাষাগত বিভ্রান্তি এড়াতে ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে হলুদ ও লাল কার্ড চালু করে।

১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচের পর জার্সি বিনিময় বিতর্কের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের উত্তপ্ত ম্যাচের পর ইংল্যান্ডের কোচ আলফ র‍্যামসের নির্দেশে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের সঙ্গে জার্সি বিনিময় করেননি ইংল্যান্ডের ফুটবলাররা। এই ম্যাচের বিতর্কই পরে ফুটবলে হলুদ ও লাল কার্ড চালুর পথ তৈরি করে।

১৯৮৬: ‘হ্যান্ড অব গড’—যে গোল আজও বিতর্কের কেন্দ্র

ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত নিঃসন্দেহে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল।

মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ড গোলরক্ষক পিটার শিলটনের আগে লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে বল জালে পাঠান দিয়েগো মারাদোনা। রেফারির চোখ এড়িয়ে গোলটি বৈধ ঘোষণা করা হয়। পরে মারাদোনা সেটিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, “অল্পটা মারাদোনার মাথা, অল্পটা ঈশ্বরের হাত।”

মাত্র চার মিনিট পরেই তিনি প্রায় অর্ধেক মাঠ ড্রিবল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলটি করেন। ফলে বিতর্কিত গোলের পাশাপাশি সেই ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসেও অমর হয়ে যায়।

ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের কাছে এটি ছিল প্রতারণার প্রতীক। অন্যদিকে অনেক আর্জেন্টাইন ফুটবলারের কাছে ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর ইংল্যান্ডকে হারানো ছিল জাতীয় আবেগের বিষয়।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে 'Hand of God' গোল করার মুহূর্তে দিয়েগো মারাদোনা
মেক্সিকো বিশ্বকাপ ১৯৮৬-এর কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে হাত দিয়ে গোল করেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক দিয়েগো মারাদোনা। ‘Hand of God’ নামে পরিচিত এই মুহূর্ত আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা।

১৯৯৮: বেকহ্যামের লাল কার্ড, সিমিওনের কৌশল

ফ্রান্স বিশ্বকাপে দুই দলের লড়াই আবারও তৈরি করে নাটকীয়তা।

মাঝমাঠে সংঘর্ষের পর আর্জেন্টিনার দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে লাল কার্ড দেখেন ডেভিড বেকহ্যাম। প্রায় এক ঘণ্টা ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় ইংল্যান্ডকে। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় তারা।

পরে সিমিওনে স্বীকার করেছিলেন, তিনি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছিলেন। অন্যদিকে বেকহ্যামও বলেন, সেই লাল কার্ড তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময় তৈরি করেছিল।

১৯৯৮ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ম্যাচে ডেভিড বেকহ্যামকে লাল কার্ড দেখাচ্ছেন রেফারি
ফ্রান্স বিশ্বকাপ ১৯৯৮-এ আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মারার অভিযোগে লাল কার্ড দেখেন ইংল্যান্ডের ডেভিড বেকহ্যাম। সেই ঘটনাই বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয়।

২০০২: প্রতিশোধের ম্যাচ

চার বছর পর জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপে আবার মুখোমুখি হয় দুই দেশ।

প্রথমার্ধে পাওয়া পেনাল্টি থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে জেতান বেকহ্যাম। ১৯৯৮ সালের হতাশার পর এই গোলই তাঁর ব্যক্তিগত মুক্তির মুহূর্ত হয়ে ওঠে।

যদিও আর্জেন্টিনা দাবি করেছিল, মাইকেল ওউয়েনের ওপর ফাউল ছিল না। পরবর্তীতে সেই ঘটনার হাস্যরসাত্মক স্মৃতিও ভাগ করে নিয়েছিলেন তৎকালীন আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার মাউরিসিও পোচেত্তিনো ও ওউয়েন।

শুধু ফুটবল নয়, ইতিহাসও সঙ্গে থাকে

ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াইকে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলা হয় শুধুমাত্র ট্রফির লড়াইয়ের জন্য নয়। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি ইতিহাস, বিতর্ক, রাজনৈতিক আবেগ এবং কিংবদন্তিদের তৈরি করা মুহূর্ত এই ম্যাচকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তাই দুই দল যখনই বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়, সেটি নিছক একটি ফুটবল ম্যাচ থাকে না—তা পরিণত হয় বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন