দীর্ঘ টানাপোড়েন ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ভারতের মাটিতে পা রাখলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)। শনিবার দুপুরে সপারিষদ দিল্লিতে পৌঁছন তিনি। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতিন প্রসাদ (Jitin Prasada)। সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন চিনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা কাই কি (Cai Qi) এবং চিনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ওয়াং ই (Wang Yi)। শনিবারই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির (Narendra Modi) সঙ্গে তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা।
২০১৯ সালের পর এই প্রথম ভারতে এলেন জিনপিং। গত কয়েক বছরে সীমান্ত সংঘাত থেকে কূটনৈতিক টানাপোড়েন—একাধিক ঘটনায় নয়াদিল্লি ও বেজিংয়ের সম্পর্ক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। গালওয়ানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ডোকলাম নিয়ে অচলাবস্থা এবং অরুণাচল প্রদেশকে ঘিরে চিনের অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে যথেষ্ট চাপ তৈরি করেছিল।
এই পরিস্থিতিতে মোদি-জিনপিং বৈঠককে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দুই রাষ্ট্রনেতার আলোচনায় প্রতিরক্ষা, সীমান্ত সমস্যা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জায়গা পেতে পারে। একইসঙ্গে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান পরিষেবা পুনরায় চালু করা নিয়েও আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুধু দ্বিপাক্ষিক বিষয় নয়, সামগ্রিক ভারত-চিন সম্পর্কের গতিপথ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হতে পারে। সীমান্তে স্থিতাবস্থা বজায় রাখা, পারস্পরিক আস্থা বাড়ানো এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার বিষয়ও আলোচনার টেবিলে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে দিল্লির এই বৈঠকের দিকে নজর রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, জিনপিং দিল্লিতে পৌঁছনোর আগেই বেজিংয়ের তরফে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা দেওয়া হয়েছে। ভারতে নিযুক্ত চিনের রাষ্ট্রদূত জু ফেইহং (Xu Feihong) সোশ্যাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন, দুই রাষ্ট্রনেতার কৌশলগত নির্দেশনা মেনে ভারত ও চিন দীর্ঘমেয়াদি এবং কৌশলগত সুসম্পর্কের পথে এগোতে পারে।
চিনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের মূল সুর ছিল—মতপার্থক্য থাকলেও তা যথাযথভাবে সামলাতে হবে এবং সহযোগিতা বাড়াতে হবে। দুই দেশকে ভালো প্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার বার্তাও দিয়েছেন তিনি। জিনপিংয়ের সফরের আগে এই বার্তাকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
ভারত-চিন সম্পর্কের সম্ভাব্য উন্নতির প্রভাব অবশ্য শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। ফলে নয়াদিল্লি ও বেজিংয়ের সম্পর্কের বরফ গললে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
ব্রিকস (BRICS) সম্মেলন নিয়েও এই সফরকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। জিনপিং ভারতে আসবেন না ধরে নিয়ে বাংলাদেশ সম্মেলন নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি—এমন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিনা প্রেসিডেন্ট নিজেই দিল্লিতে এলেন। ফলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক হিসাব কতটা বদলাল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, ভারত ও চিন যদি সীমান্ত ও অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলি আলোচনার মাধ্যমে সামলে সহযোগিতার দিকে এগোয়, তাহলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক শক্তির সমীকরণেও পড়বে। ওয়াশিংটনও স্বাভাবিকভাবেই এই বৈঠকের ফলাফল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। তাই মোদি-জিনপিং বৈঠক শুধু দিল্লি-বেজিং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নয়, বৃহত্তর এশীয় কূটনীতির দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।



