২৪ ঘণ্টার দিল্লি সফরে কী পেল চিন? Xi-এর BRICS কৌশলে ভারত-সহ Global South-এ বড় বার্তা

সাত বছর পর ভারতে এসে BRICS সম্মেলনে AI, বাণিজ্য ও Greater BRICS-এর নতুন উদ্যোগের প্রস্তাব দিলেন শি জিনপিং; মোদির সঙ্গে বৈঠকে সীমান্ত ও বাণিজ্য ঘাটতিও আলোচনায়।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ২৪ ঘণ্টার ভারত সফর শেষ হয়েছে। সাত বছর পর ভারতে এসে ১৮তম BRICS সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন তিনি। সেই বৈঠকে সীমান্তে শান্তি, বাণিজ্য, বাজারে প্রবেশাধিকার, সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে BRICS মঞ্চে চিনের পক্ষ থেকে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার একাধিক প্রস্তাবও সামনে এসেছে।

শি জিনপিংয়ের এই সফরকে শুধু ভারত-চিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দিল্লিতে BRICS সম্মেলনে চিনের মূল লক্ষ্য ছিল সম্প্রসারিত BRICS-কে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। শি নিজেই ‘Greater BRICS’-এর মধ্যে শিল্প ও সরবরাহ-শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা, একটি সমন্বিত বাজার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে বাস্তব সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেছেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলির একটি এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ক্ষেত্রে। চিন BRICS AI Open Source Zone তৈরিতে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এর লক্ষ্য বৃহৎ ভাষা মডেল, AI প্রশিক্ষণ এবং ওপেন AI ইকোসিস্টেমে সদস্য দেশগুলির সহযোগিতা বাড়ানো। অর্থাৎ, AI-কে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোয় BRICS-এর একটি পৃথক সহযোগিতামূলক ক্ষেত্র তৈরি করতে চাইছে বেজিং।

এর পাশাপাশি BRICS Special Economic Zone Partnership গড়ার প্রস্তাবও দিয়েছেন শি। আগামী বছর চিনে BRICS Service Trade Forum আয়োজনের কথাও জানিয়েছেন তিনি। এই উদ্যোগগুলির মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং পরিষেবা ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলির পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ানোর লক্ষ্য স্পষ্ট।

দিল্লিতে মোদির সঙ্গে বৈঠকেও চিনের অর্থনৈতিক স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। দুই দেশের বাণিজ্য ২০২৫ সালে রেকর্ড ১৫৫.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে চিনা কাস্টমসের তথ্য উদ্ধৃত করে Reuters জানিয়েছে। কিন্তু এই বাণিজ্যে ভারতের ঘাটতি অত্যন্ত বড়—২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে চিন থেকে ভারতের আমদানি প্রায় ১৩২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে চিনে ভারতের রফতানি তার তুলনায় অনেক কম।

তাই ভারত-চিন বৈঠকে শুধু বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর কথা নয়, বরং বাণিজ্য ঘাটতি, সরবরাহ-শৃঙ্খলের সমস্যা এবং দুই দেশের বাজারে আরও অর্থবহ ও পূর্বানুমানযোগ্য প্রবেশাধিকারের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভিসা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং শিল্প সরঞ্জাম বিক্রির ক্ষেত্রে থাকা কিছু বাধা এখনও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

তবে শি জিনপিংয়ের সফরের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক ছিল সীমান্ত প্রশ্ন। ২০২০ সালের সংঘর্ষের পর ভারত-চিন সম্পর্কে যে গভীর অবনতি হয়েছিল, তা পুরোপুরি কাটেনি। সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা কমলেও হিমালয় অঞ্চলে দুই দেশের উল্লেখযোগ্য সেনা মোতায়েন রয়েছে এবং সীমান্ত আলোচনাও ধীরগতিতে চলছে।

মোদির বক্তব্যে তাই সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ উন্নতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে শি বলেছেন, চিন ভারত-চিন সম্পর্ককে কৌশলগত এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিতে দেখে। দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ফের বাড়ছে এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হচ্ছে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।

BRICS মঞ্চে অবশ্য চিনের বার্তা আরও বিস্তৃত ছিল। বর্তমানে সম্প্রসারিত এই গোষ্ঠীতে ভারত, চিন, রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি ইরান, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, ইথিওপিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি রয়েছে। আরও কয়েকটি দেশ অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ায় BRICS-এর প্রভাব Global South-এর বিস্তৃত অংশে ছড়িয়েছে।

এই বৃহত্তর পরিসরকে কাজে লাগিয়ে চিন BRICS-কে শুধু রাজনৈতিক আলোচনার মঞ্চে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না—শিল্প, প্রযুক্তি, পরিষেবা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলের মতো ক্ষেত্রে কার্যকর সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করতে চাইছে। শির বক্তব্যে এই কৌশলই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

তবে BRICS সম্মেলনে চিনের প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি ভারতেরও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য এসেছে। ৪৫ পাতার New Delhi Declaration-এ ১৪০টি পয়েন্টে সন্ত্রাসবাদ, বাণিজ্য, নিষেধাজ্ঞা, West Asia, শক্তি, অর্থনীতি এবং Global South-এর ভূমিকা নিয়ে সদস্য দেশগুলি ঐকমত্যে পৌঁছেছে। ভারতীয় কূটনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতপার্থক্যের মধ্যেও যৌথ ঘোষণায় ঐকমত্য তৈরি করা।

ঘোষণাপত্রে ২০২৫ সালের পহেলগাম হামলারও স্পষ্ট নিন্দা করা হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘zero tolerance’ অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামো শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে একতরফা সামরিক পদক্ষেপ, বাণিজ্যিক বাধা এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে BRICS।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, BRICS-এর পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে চিন দায়িত্ব নেবে। ফলে দিল্লি সম্মেলনে শি জিনপিংয়ের প্রস্তাবগুলি শুধু বর্তমান সম্মেলনের বক্তব্য নয়; আগামী এক বছরে BRICS-এর কর্মসূচির দিকনির্দেশেও তার প্রভাব পড়তে পারে। AI, পরিষেবা-বাণিজ্য এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে চিনের প্রস্তাব সেই সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সব মিলিয়ে, শি জিনপিংয়ের ২৪ ঘণ্টার ভারত সফর থেকে চিনের লাভকে একক কোনও দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে মাপা কঠিন। বরং দিল্লি সফরে বেজিং একদিকে ভারত-চিন সম্পর্ককে সংঘাত থেকে নিয়ন্ত্রিত সহযোগিতার দিকে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে BRICS-এর বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিসরকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ সামনে এনেছে। ভারত অবশ্য সীমান্তে শান্তি, বাণিজ্য ঘাটতি এবং পারস্পরিক বাজার-অ্যাক্সেসের মতো প্রশ্নকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখে সেই সম্পর্কের শর্তও স্পষ্ট করেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন