নজরবন্দি ব্যুরো: ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন। কিন্তু ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই বড় হয়ে উঠছে অন্য একটি প্রশ্ন—নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে তৃণমূল আদৌ কাকে প্রার্থী করবে? ২০২১-এর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম শুভেন্দু অধিকারীর সেই হাইভোল্টেজ দ্বৈরথের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা আপাতত নেই। বরং বিজেপি যেখানে ব্যবধান আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে মাঠে নামছে, সেখানে তৃণমূলের দুই শিবিরের মধ্যেই প্রার্থী বাছাই নিয়ে অনিশ্চয়তা স্পষ্ট।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১,৯৫৬ ভোটে পরাজিত হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে আবারও এই আসন থেকে জয়ী হন শুভেন্দু—এ বার ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় ৯,৬৬৫। একই নির্বাচনে ভবানীপুর থেকেও জয় পাওয়ার পর নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ ছেড়ে দেন তিনি। সেই কারণেই ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন হচ্ছে। ভোটগণনা ৯ অক্টোবর।
এ বার তাই নন্দীগ্রামে সরাসরি শুভেন্দু-মমতা লড়াই হচ্ছে না। বিজেপির লক্ষ্য বরং ২০২৬-এর ব্যবধানকে আরও বড় করা। সম্প্রতি নন্দীগ্রামে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কর্মী-সমর্থকদের সামনে ফলতার উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে রেকর্ড ব্যবধানে জয়ের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলতায় বিজেপি প্রায় ১ লক্ষ ৯ হাজার ভোটে জিতেছিল। নন্দীগ্রামেও সেই ব্যবধান ছাপানোর লক্ষ্য নিয়েই বিজেপি সংগঠনকে প্রস্তুত করছে। [নন্দীগ্রামে উপনির্বাচনের আগে কোথায় পবিত্র কর? ফোনে মিলল উত্তর, বাড়ল রাজনৈতিক জল্পনা]
বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের বক্তব্যেও আত্মবিশ্বাসের সুর। কাঁথির সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, তাঁদের লক্ষ্য অন্তত ১ লক্ষ ১০ হাজার ভোটের ব্যবধান। বিজেপির এই হিসাব বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা অবশ্য নির্ভর করবে উপনির্বাচনে বিরোধী ভোটের বিভাজন এবং প্রার্থীদের উপর।
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৃণমূলকে ঘিরে। সাম্প্রতিক সময়ে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন নন্দীগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনেও প্রার্থী বাছাইকে কঠিন করে তুলেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের পাশাপাশি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন পৃথক তৃণমূল শিবিরও প্রার্থী দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এনসিপিআই-তৃণমূলের তরফে এখনও নন্দীগ্রাম উপনির্বাচন নিয়ে প্রকাশ্য তৎপরতা দেখা যায়নি।
নন্দীগ্রামে তৃণমূলের পুরনো সংগঠনের একাধিক পরিচিত মুখও এখন দলের বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানাচ্ছেন। শেখ সুফিয়ান এবং আবু তাহেরের মতো নেতারা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, স্থানীয় স্তরে তৃণমূলের পুরনো সংগঠনকে ফের সক্রিয় করা সহজ হবে না।
আবু তাহেরের কাছে উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি এমন প্রস্তাব পেলে তা প্রত্যাখ্যান করবেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, সুসময়ে দল তাঁকে প্রয়োজন মনে করেনি, অথচ এখন কঠিন সময়ে তাঁকে প্রার্থী করার চেষ্টা হলে তিনি তা গ্রহণ করবেন না। একই সঙ্গে তিনি নিজেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী বলেও দাবি করেছেন।
শেখ সুফিয়ানের বক্তব্য আরও কড়া। তাঁর অভিযোগ, নন্দীগ্রামের রাজনীতিতে স্থানীয় নেতৃত্বকে গুরুত্ব না দিয়ে বাইরে থেকে নেতাদের এনে সংগঠন পরিচালনা করা হয়েছে। দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও প্রকাশ্যে হতাশা জানিয়েছেন তিনি। তবে এগুলি তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত ও অভিযোগ—তৃণমূল নেতৃত্বের পক্ষ থেকে তার পাল্টা বক্তব্যও রয়েছে কি না, সেটি আলাদাভাবে বিবেচ্য।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে তৃণমূল প্রার্থী করেছিল পবিত্র করকে। তিনি আগে বিজেপিতে ছিলেন এবং ভোটের আগে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে শুভেন্দু ৯,৬৬৫ ভোটে জয়ী হন। উপনির্বাচনের আগে পবিত্র করকে ঘিরে তৃণমূলের কোনও সক্রিয় নির্বাচনী ভূমিকা এখনও সামনে আসেনি।
মমতা-শিবিরের হয়ে নন্দীগ্রামে সাংগঠনিক প্রস্তুতিতে অবশ্য অখিল গিরি সক্রিয় হয়েছেন। নন্দীগ্রাম ১ ও ২ নম্বর ব্লকের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রার্থী বাছাই নিয়ে স্থানীয় স্তরে মতামত নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জেলা স্তরের আলোচনা শেষ করে রাজ্য নেতৃত্ব এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রার্থী নিয়ে আলোচনা হবে।
অন্য দিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরও নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর—দুই কেন্দ্রেই প্রার্থী দেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে তাদের অবস্থানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে নন্দীগ্রামে প্রার্থী হলে তাঁরা প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথা বলেছেন। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একদিকে মমতাকে ফের নন্দীগ্রামে লড়াইয়ে নামার আহ্বান জানানো হয়েছে, অন্যদিকে বর্তমান তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও প্রকাশ্যে এসেছে।
তৃণমূলের প্রার্থী নিয়ে সংশয় আরও বাড়িয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের সাম্প্রতিক সর্বদল বৈঠক। উপনির্বাচনকে সামনে রেখে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের ডাকা বৈঠকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকলেও তৃণমূলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে নন্দীগ্রামে তৃণমূলের সাংগঠনিক প্রস্তুতি কতটা জোরালো, তা নিয়েই রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
বিরোধী ভোটের অন্য প্রান্তে বামেরাও নিজেদের সংগঠন ফের সক্রিয় করার চেষ্টা শুরু করেছে। বাড়ি বাড়ি জনসংযোগ এবং দেওয়াল লিখনের প্রস্তুতি চলছে বলে দলের স্থানীয় নেতাদের দাবি। তবে নন্দীগ্রামে বামেদের প্রার্থী কে হবেন, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
নন্দীগ্রাম ঐতিহাসিক ভাবে বামেদেরও গুরুত্বপূর্ণ আসন। অতীতে একাধিকবার সিপিআই এই কেন্দ্র থেকে জিতেছে। ২০২১ সালে মমতা-শুভেন্দুর দ্বৈরথে সিপিএম মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়কে প্রার্থী করেছিল। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে আবার সিপিআই প্রার্থী দিয়েছিল। উপনির্বাচনে কোন বাম দল প্রার্থী দেবে, তা নিয়ে বামফ্রন্টের মধ্যে আলোচনা চলছে। সিপিআই আসনটি নিজেদের ঐতিহ্যগত আসন হিসেবে দাবি করেছে।
কংগ্রেস অবশ্য অপেক্ষা না করে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে মিলন প্রধানকে প্রার্থী করেছে তারা। ১১ সেপ্টেম্বর কংগ্রেস নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর—দুই কেন্দ্রের প্রার্থী ঘোষণা করে।
ফলে নন্দীগ্রামে এখন ছবিটা অদ্ভুত। বিজেপির সামনে স্পষ্ট লক্ষ্য—২০২৬-এর জয়কে আরও বড় ব্যবধানে নিয়ে যাওয়া। বামেরা নিজেদের পুরনো সংগঠন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। কংগ্রেস ইতিমধ্যেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে। আর তৃণমূলের দুই শিবির প্রার্থী দেওয়ার কথা বললেও স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য ‘ভূমিপুত্র’ মুখ কে হবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
১৬ সেপ্টেম্বর মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন। তার পরেই পরিষ্কার হবে নন্দীগ্রামে শেষ পর্যন্ত কতগুলি রাজনৈতিক শক্তি সরাসরি লড়াইয়ে থাকছে। আপাতত তাই ৬ অক্টোবরের ভোটের সবচেয়ে বড় লড়াই শুধু ব্যালটের নয়—তৃণমূলের জন্য এটি সংগঠন এবং প্রার্থী খোঁজার পরীক্ষাও।



