নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়ায় প্রশাসনিক সভা থেকে একের পর এক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। রাস্তা, আবাসন, স্বাস্থ্য পরিষেবা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে মহিলা কল্যাণ—একাধিক ক্ষেত্রে নতুন প্রকল্পের কথা তুলে ধরলেন তিনি। অন্নপূর্ণা যোজনা (Annapurna Yojana)-য় ৬৭ হাজার মহিলার অ্যাকাউন্টে ইতিমধ্যেই টাকা পৌঁছেছে বলেও জানালেন মুখ্যমন্ত্রী।
সোমবার রেয়াপাড়া শিবমন্দির ময়দানে আয়োজিত প্রশাসনিক সভায় নন্দীগ্রামের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, সরকারের সাড়ে তিন মাসের মধ্যেই নন্দীগ্রামে ৩২টি রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। ১৭টি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত এই এলাকায় পরিকাঠামো উন্নয়নে আরও কাজ হবে বলেও জানান তিনি।
আবাসন প্রকল্পেও বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরে নন্দীগ্রামে ১১,৭০০টি নতুন বাড়ি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। যোগ্য উপভোক্তাদের প্রথম কিস্তি হিসেবে ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি ‘বিকশিত ভারত জি রামজি’ জব কার্ডের আওতায় ১২৫ দিনের কাজের সূচনার কথাও তুলে ধরেন।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির জন্যও আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করা হয়েছে। সভা থেকে প্রতিটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর অ্যাকাউন্টে ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা জানান শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, এই অর্থ মহিলাদের স্বনির্ভরতা এবং ছোট উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজে লাগবে।
মহিলা কল্যাণের ক্ষেত্রে অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়েও পরিসংখ্যান দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামের ৬৭ হাজার মহিলার অ্যাকাউন্টে ইতিমধ্যেই মাসে ৩ হাজার টাকা করে পৌঁছেছে। আরও প্রায় ৫ হাজার আবেদন যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্য পরিষেবাতেও একাধিক পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। রেয়াপাড়া ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শয্যাসংখ্যা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৬০ করার কথা জানান শুভেন্দু। নন্দীগ্রাম জেলা হাসপাতালে নতুন মাতৃসদন ভবনের কাজ শুরু, রোগীর আত্মীয়দের জন্য নাইট শেল্টার এবং নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে জনৌষধি কেন্দ্র চালুর কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এর পাশাপাশি চালু হয়েছে ‘মা-আহার’ ক্যান্টিন। সেখানে ৫ টাকায় খাবার পাওয়া যাবে বলে জানানো হয়েছে। সপ্তাহে দু’দিন মাছ দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। নন্দীগ্রামে কোনও অস্বাভাবিক মৃত্যু বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের জন্য আর তমলুকে যেতে হবে না বলেও জানান তিনি। এলাকায় পুলিশ মর্গ তৈরির ঘোষণাও করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) নিশানা করেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, আগের সরকারের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ভুয়ো কার্ডের অভিযোগ ছিল। বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যবিমা পরিষেবার আওতায় আরও বেশি মানুষকে আনার কথা জানিয়ে তিনি ১৯০০ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগের কথাও বলেন।
নন্দীগ্রাম-হলদিয়া যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও বড় ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। দুই এলাকার মধ্যে সেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে শুভেন্দু বলেন, ভূমিপুজোর অনুষ্ঠানেও তিনি উপস্থিত থাকবেন। সেতু দিয়ে প্রথম গাড়ি তিনিই চালাবেন বলেও মন্তব্য করেন।
রেল যোগাযোগের প্রসঙ্গেও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামের রেল প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমির মধ্যে ইতিমধ্যেই সাড়ে তিন একর রেলকে দেওয়া হয়েছে এবং বাকি জমিও দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। একইসঙ্গে নন্দীগ্রামে সরকারি বাস পরিষেবা আরও বাড়ানোর কথা জানান তিনি।
এদিন নন্দীগ্রামের পুরনো মামলা নিয়েও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রামে ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহারের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি খাল সংস্কার করে কাঠের পুলের জায়গায় নতুন ব্রিজ তৈরির পরিকল্পনা এবং আধুনিক বাসস্ট্যান্ড তৈরির কথাও জানান তিনি।
শেষে নন্দীগ্রামের মানুষের কাছে ভোটের ব্যবধান আরও বাড়ানোর আবেদন করেন শুভেন্দু। তিনি মনে করিয়ে দেন, আগের বার নন্দীগ্রাম থেকে ৮২ হাজার ভোটে জয় পেয়েছিলেন। এবার সেই ব্যবধান ছাপিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে তাঁর বার্তা, নন্দীগ্রাম তাঁর সরকারের কাছে সবসময়ই অগ্রাধিকারের জায়গায় থাকবে।



