১৪ বছর ধরে ঝুলে থাকা প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস হত্যা মামলায় এবার সাক্ষ্য দিলেন তাঁর ৯২ বছরের বাবা জগদীশ বিশ্বাস। সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ ট্র্যাক-১ আদালতে বিচারক দুর্গাশঙ্কর রানার এজলাসে সাক্ষ্য দিতে এসে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন বৃদ্ধ। ছেলের হত্যার বিচার চেয়ে আদালতের সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাঁর একটাই আবেদন—“ছেলে যেন বিচার পায়।”
২০১২ সালের ৫ জুলাই খুন হয়েছিলেন শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস। দীর্ঘ ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনও শেষ হয়নি। বরুণের পরিবারের অভিযোগ, এত বছর ধরে তদন্তের নামে কার্যত প্রহসন চলেছে। সম্প্রতি পরিবারের সদস্যরা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) সঙ্গে দেখা করেন। সেই সাক্ষাতের পর মামলার সরকারি আইনজীবীকেও বদল করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
বরুণ বিশ্বাসের নাম জড়িয়ে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার বহুচর্চিত ‘সুটিয়া গণধর্ষণ কাণ্ড’-এর সঙ্গেও। বাম আমলে ওই ঘটনায় গোটা রাজ্যে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। সেই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ছিলেন কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশন (মেন) স্কুলের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক বরুণ।
২০১২ সালের ৫ জুলাই স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে গোবরডাঙা স্টেশনের বাইরে গুলিবিদ্ধ হন বরুণ। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রতিবাদী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত বরুণের মৃত্যু সেই সময় গোটা রাজ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের এত বছর পরেও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে তাঁর পরিবারের।
এখন বনগাঁ আদালতে সেই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। সোমবার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আদালতে হাজির হন বরুণের বাবা জগদীশ বিশ্বাস। তিনি এই মামলার ৩৮ নম্বর সাক্ষী। বয়সের ভার সত্ত্বেও এদিন আদালতে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্য জানান তিনি।
সাক্ষ্য দেওয়ার সময়ই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি বৃদ্ধ। আদালতের এজলাসে ছেলের কথা বলতে গিয়ে অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন তিনি। দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা ও ক্ষোভ যেন একসঙ্গে বেরিয়ে আসে তাঁর কথায়।
জগদীশবাবুর অভিযোগ, বরুণ খুন হওয়ার পর তৎকালীন পুলিশ এবং তদন্তকারী সিআইডি আধিকারিকদের কাছ থেকে তিনি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাননি। এমনকী নিজের বক্তব্যও ঠিকমতো জানাতে দেওয়া হয়নি বলে আদালতে অভিযোগ করেন তিনি।
বৃদ্ধের দাবি, ছেলের মৃত্যুর পর তদন্তের বিষয়ে তিনি একাধিক প্রশ্নের উত্তর চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে তদন্তকারীদের আচরণ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। এদিন আদালতে সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরেন বরুণের বাবা।
আদালতে দাঁড়িয়ে ৯২ বছরের বৃদ্ধের একটাই আবেদন ছিল—ছেলের হত্যার ঘটনায় যেন সঠিক বিচার হয়। তাঁর সেই আবেগঘন বক্তব্য এবং কান্নায় এদিন বনগাঁ আদালতের পরিবেশও ভারী হয়ে ওঠে।
এদিন আদালতে জগদীশ বিশ্বাসের সঙ্গে ছিলেন বরুণের দাদা অসিত বিশ্বাস, দিদি এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারটি ফের আশাবাদী, সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে মামলাটি এবার দ্রুত এগোবে।
বরুণ বিশ্বাস হত্যা মামলার পরবর্তী শুনানিতে আরও সাক্ষ্যগ্রহণ হওয়ার কথা। ১৪ বছর পরও যে মামলায় নিহত শিক্ষকের পরিবারের অপেক্ষা শেষ হয়নি, সেখানে ৯২ বছরের বাবার এদিনের সাক্ষ্য ফের সেই পুরনো প্রশ্নই সামনে আনল—কবে মিলবে বরুণের পরিবারের প্রতীক্ষিত বিচার?



