দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত, প্রশাসনিক টানাপোড়েন এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের উত্তপ্ত অধ্যায় পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে ঘিরে নতুন কৌশল নিতে শুরু করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দপ্তর থেকে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে— অর্থের অভাবে পশ্চিমবঙ্গের কোনও উন্নয়ন প্রকল্প যাতে থমকে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সেই নির্দেশের পরই কেন্দ্রীয় প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে শুরু হয়েছে তৎপরতা।
কেন্দ্রীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে চলমান বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্পে কীভাবে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা যায়, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে অর্থ মন্ত্রক এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে আটকে থাকা অর্থ দ্রুত মেটানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে বিপর্যয় মোকাবিলা, পরিকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন, গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং কৃষি খাতে বকেয়া অর্থ ছাড়ের বিষয়ে সক্রিয় হয়েছে কেন্দ্র। প্রশাসনিক মহলের মতে, এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নতুন গতি আসতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সূত্রে দাবি, বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অগ্রগতি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে নজর রাখছেন নরেন্দ্র মোদি। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও নিয়মিত খোঁজখবর নিচ্ছেন বলে জানা গিয়েছে।
কেন্দ্রের এক শীর্ষ আধিকারিকের বক্তব্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পশ্চিমবঙ্গে উন্নয়ন নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে দ্রুত আর্থিক সহায়তা ও প্রশাসনিক সমন্বয় প্রয়োজন। সেই কারণেই কেন্দ্রীয় স্তরে বিষয়টি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সূত্রের দাবি, গ্রামীণ উন্নয়ন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, জাতীয় সড়ক প্রকল্প এবং বিপর্যয় মোকাবিলা তহবিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে দ্রুত অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে আপাতত শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের জন্য আলাদা করে কোনও বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণার পথে হাঁটতে চাইছে না কেন্দ্র।
কেন্দ্রের আশঙ্কা, একটি রাজ্যের জন্য বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করলে অন্য রাজ্যগুলিও একই ধরনের দাবি তুলতে পারে। তাই বিদ্যমান প্রকল্প, অতিরিক্ত বরাদ্দ এবং বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমেই পশ্চিমবঙ্গকে আর্থিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অতীতে বিহার ও অন্ধ্রপ্রদেশের ক্ষেত্রে যে মডেল অনুসরণ করা হয়েছিল, বাংলার ক্ষেত্রেও সেই পথেই এগোতে পারে কেন্দ্র।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের পিছনে শুধুমাত্র প্রশাসনিক নয়, গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর দ্রুত উন্নয়নমূলক কাজের গতি দেখানো এখন রাজ্য সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই লক্ষ্য পূরণে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা অপরিহার্য।
আগামী জুন মাসে রাজ্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ হওয়ার কথা। তার আগে কেন্দ্রীয় সহায়তা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রাজ্য সরকারের জন্য বড় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, পশ্চিমবঙ্গকে ঘিরে কেন্দ্রের এই সক্রিয়তা শুধু রাজ্যের উন্নয়ন নয়, আগামী দিনের জাতীয় রাজনৈতিক সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘদিনের কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের আবহে নতুন এই সমন্বয়ের ইঙ্গিত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলের।



