ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে ফের নতুন বিতর্কের সূত্রপাত। কার্গিল বিজয় দিবসের আবহে মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা ফেয়ার (C. Christine Fair) দাবি করেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মূল কারণ কেবল কাশ্মীর নয়। তাঁর মতে, ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, সামরিক এবং কূটনৈতিক শক্তিই ইসলামাবাদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। এমনকি কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হলেও পাকিস্তানের ভারতবিরোধী নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
দীর্ঘ সাত দশকের বেশি সময় ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সীমান্ত সন্ত্রাস, সামরিক সংঘর্ষ, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সেই প্রচেষ্টা বারবার ভেস্তে গেছে। এই প্রেক্ষাপটে ক্রিস্টিনা ফেয়ারের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ফেয়ারের মতে, কাশ্মীর পাকিস্তানের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইস্যু হলেও সেটিই মূল সমস্যা নয়। তাঁর দাবি, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের দ্রুত উত্থান, বিশ্বের অন্যতম দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে অবস্থান, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণ, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং আঞ্চলিক নেতৃত্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা কাঠামোর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে যদি কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধানও হয়ে যায়, তবুও পাকিস্তানের নীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। কারণ, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাছে ভারত কেবল একটি প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং একটি ‘অস্তিত্বগত প্রতিদ্বন্দ্বী’। তাঁর ব্যাখ্যায়, কাশ্মীর এই বৃহত্তর প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি প্রতীক এবং কৌশলগত হাতিয়ার মাত্র।
নিজের বক্তব্যের পক্ষে ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ক্রিস্টিনা ফেয়ার। ওই যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশে পরিণত হয়। তাঁর মতে, এটি পাকিস্তানের ইতিহাসে অন্যতম বড় সামরিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় হলেও, সে দেশের সামরিক নেতৃত্ব এবং সরকারি বয়ানে সেই পরাজয়কে এখনও পুরোপুরি স্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায় না।
ফেয়ারের দাবি, পাকিস্তান এখনও নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একমাত্র কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরতে চায়। এই ধারণাই দেশটির সামরিক কৌশল, পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ানের অন্যতম ভিত্তি। ফলে ভারতবিরোধী অবস্থানকে জাতীয় নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
তাঁর বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বৃহত্তর কৌশল শুধু কাশ্মীর ইস্যুকে সামনে রাখা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে সীমিত করার চেষ্টা। সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদ, প্রক্সি যুদ্ধ এবং বিভিন্ন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডকেও তিনি এই কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যদিও এগুলি ক্রিস্টিনা ফেয়ারের ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন; বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গবেষক ও নীতিনির্ধারকের মধ্যে ভিন্ন মতও রয়েছে।



