বিশ্ব শাসন ব্যবস্থায় সংস্কারের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির (Narendra Modi) সরব হওয়ার মধ্যেই বড় বার্তা এল রাষ্ট্রসংঘ (United Nations) থেকে। নিরাপত্তা পরিষদ (UN Security Council)-সহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা ফের সামনে আনল রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের (António Guterres) দফতর। তবে এই সমর্থনকে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ নিশ্চিত হওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রশ্ন এখন একটাই—নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের আলোচনা কি ভারতকে স্থায়ী সদস্যপদের আরও কাছে নিয়ে যাবে?
ব্রিকস (BRICS)-এর মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মোদি সরাসরি রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের পক্ষে সওয়াল করেন। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি।
প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির কাঠামো তৈরি হয়েছিল, একবিংশ শতকের বাস্তবতা তার থেকে অনেকটাই বদলে গিয়েছে। সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও থাকা প্রয়োজন।
মোদির বক্তব্যের পরই রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফান ডুজারিচ (Stéphane Dujarric) নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গুতেরেস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন।
ডুজারিচের বক্তব্যের মূল সুর ছিল, বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ১৯৪৫ সালের বাস্তবতার তুলনায় একুশ শতকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। ফলে নিরাপত্তা পরিষদ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাঠামোতেও সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন থাকা দরকার।
এখানেই ভারতের দাবি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমানে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মোট ১৫টি সদস্য দেশ রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি দেশ স্থায়ী সদস্য—আমেরিকা (United States), রাশিয়া (Russia), চিন (China), ব্রিটেন (United Kingdom) এবং ফ্রান্স (France)। বাকি ১০টি আসন অস্থায়ী এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সদস্য দেশগুলি নির্বাচিত হয়।
স্থায়ী পাঁচ সদস্যের হাতে রয়েছে ভেটো ক্ষমতা। ফলে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার হলে নতুন কোনও দেশকে স্থায়ী সদস্য করার প্রশ্নটি শুধু আসন বাড়ানোর বিষয় নয়; ভেটো ক্ষমতার কাঠামোও তার সঙ্গে জড়িত।
দীর্ঘদিন ধরেই ভারত নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের অন্যতম দাবিদার। নয়াদিল্লির যুক্তি, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে ভারতের বর্তমান ব্যবস্থায় আরও কার্যকর প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত।
ভারতের পাশাপাশি জাপান (Japan), জার্মানি (Germany) ও ব্রাজিলও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের দাবিতে সক্রিয়। এই দেশগুলিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ‘G4’ নামে একটি কূটনৈতিক জোটও রয়েছে।
তবে রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র সংস্কারের পক্ষে কথা বললেই ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ নিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে—এমনটা বলা যাবে না। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট্রসংঘের সনদ সংশোধন করতে হয়। সেই প্রক্রিয়ায় ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং সদস্য দেশগুলির সাংবিধানিক অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাধাগুলির একটি হল ভেটো। নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রত্যেকেরই ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। ফলে নতুন স্থায়ী সদস্য যুক্ত করার প্রশ্নে শুধু সাধারণ পরিষদের সমর্থন যথেষ্ট নয়; বর্তমান স্থায়ী সদস্যদের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চিনের অবস্থান এই কারণে ভারতের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বেজিং অতীতে নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ নিয়ে সরাসরি উৎসাহ দেখায়নি। ফলে একই আন্তর্জাতিক মঞ্চে চিনের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে মোদির সংস্কারের দাবি এবং তার পর রাষ্ট্রসংঘের তরফে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা—দুই ঘটনাই কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে রাষ্ট্রসংঘের অবস্থানকে ভারতের পক্ষে সরাসরি ‘চিনকে কোণঠাসা করা’ হিসেবেও দেখা ঠিক হবে না। মহাসচিবের দফতর যে বক্তব্য দিয়েছে, তা মূলত নিরাপত্তা পরিষদের সামগ্রিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। সেখানে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদকে আলাদা করে অনুমোদন করা হয়নি।
তবু নয়াদিল্লির জন্য এই বক্তব্যের গুরুত্ব কম নয়। কারণ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক আলোচনায় যত বেশি গুরুত্ব পাবে, ভারতের মতো দীর্ঘদিনের দাবিদার দেশগুলির প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও তত বেশি সামনে আসবে।
ভারতের দাবি শুধু জনসংখ্যার উপর নির্ভর করে নয়। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি, দ্রুত বাড়তে থাকা কূটনৈতিক প্রভাব, রাষ্ট্রসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দীর্ঘদিনের অবদান এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক—সবকিছুকেই স্থায়ী সদস্যপদের দাবির পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরে নয়াদিল্লি।
অন্যদিকে, নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কারের প্রশ্নে শুধু স্থায়ী সদস্যের সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। কোন দেশগুলি নতুন করে স্থায়ী সদস্য হবে, তাদের ভেটো থাকবে কি না, অস্থায়ী সদস্যপদের কাঠামো কী হবে—এই প্রতিটি প্রশ্নেই আন্তর্জাতিক মতভেদ রয়েছে।
এ কারণে রাষ্ট্রসংঘের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ভারতের জন্য একটি কূটনৈতিক ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু এটিকে স্থায়ী সদস্যপদের চূড়ান্ত সিলমোহর বলা এখনও অনেক দূরের কথা। সামনে সবচেয়ে বড় লড়াই হবে সংস্কারের বিষয়ে সদস্য দেশগুলির মধ্যে ঐকমত্য তৈরি করা।
মোদির বক্তব্য এবং গুতেরেসের দফতরের প্রতিক্রিয়া অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—১৯৪৫ সালের কাঠামোয় একবিংশ শতকের বিশ্বকে প্রতিনিধিত্ব করানো নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। সেই সংস্কারের দরজা সত্যিই খুললে ভারত সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান দাবিদার। কিন্তু নয়াদিল্লির হাতে ভেটো ক্ষমতা কবে আসবে, তার উত্তর এখনও আন্তর্জাতিক কূটনীতির টেবিলেই আটকে।



