চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)-এর ভারত সফরের আগে দিল্লিকে বন্ধুত্বের বার্তা দিল বেজিং। মতপার্থক্য থাকলেও তা সদর্থক আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন ভারতে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত জু ফেইহং (Xu Feihong)। ফলে বহু টানাপোড়েনের পর মোদি-জিনপিং বৈঠক ঘিরে নতুন করে কূটনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
চিনা রাষ্ট্রদূতের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেজিংয়ের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) এবং শি জিনপিংয়ের মধ্যে পরপর তিন বছর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হতে চলেছে। কাজান ও তিয়ানজিনে দুই নেতার সাক্ষাতের পর এবার ফের তাঁদের মুখোমুখি বৈঠক হবে।
জু ফেইহংয়ের বার্তায় জোর দেওয়া হয়েছে দুই রাষ্ট্রনেতার ‘কৌশলগত নির্দেশ’-এর উপর। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত ও চিন দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালনা করবে। পাশাপাশি সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়ানো এবং মতপার্থক্য যথাযথভাবে সামলানোর উপরেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
চিনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে দুই দেশকে ভালো প্রতিবেশী, বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ এবং পরস্পরের সাফল্যে সহযোগী অংশীদার হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা রয়েছে। জিনপিংয়ের ভারত সফরের আগে এই ধরনের প্রকাশ্য কূটনৈতিক বার্তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল।
কারণ, গত কয়েক বছরে ভারত-চিন সম্পর্ক একাধিক কঠিন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। গালওয়ান সংঘর্ষ, ডোকলাম নিয়ে টানাপোড়েন এবং অরুণাচল প্রদেশকে ঘিরে বেজিংয়ের অবস্থান—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতির মধ্যে জিনপিংয়ের ভারত সফর এবং মোদির সঙ্গে বৈঠককে সম্পর্ক মেরামতের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
২০১৯ সালে শেষবার ভারতে এসেছিলেন শি জিনপিং। তারপর থেকে সীমান্ত সংঘাত ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে দুই দেশের সম্পর্কের সমীকরণ অনেকটাই বদলে যায়। সেই জায়গা থেকে ফের দুই রাষ্ট্রনেতার নিয়মিত বৈঠক এবং চিনের তরফে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রকাশ্য বার্তা নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এর প্রভাব পড়তে পারে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণেও। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে চিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রেক্ষিতে দিল্লি-বেজিং সম্পর্কের সম্ভাব্য উষ্ণতা নজর কাড়ছে। ভারত ও চিন নিজেদের মতপার্থক্য আলোচনার মাধ্যমে কমাতে পারলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিকস নিয়ে ঢাকার অবস্থান এবং চিনের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সমীকরণের প্রেক্ষাপটে জিনপিংয়ের ভারত সফর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। চিনের উপর কূটনৈতিক নির্ভরতার জায়গা থেকে দিল্লি-বেজিং সম্পর্কের উন্নতি বাংলাদেশের জন্য কতটা সুবিধাজনক হবে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের কাছেও মোদি-জিনপিং বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত ও চিনের মধ্যে সীমান্ত ও বাণিজ্যিক মতপার্থক্য কমে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়লে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামাবাদের কৌশলগত সমীকরণে তার প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে ভারত-চিন সম্পর্কের পরিবর্তনের দিকে ঘনিষ্ঠ নজর থাকবে আমেরিকারও।
সব মিলিয়ে শি জিনপিংয়ের ভারত সফর শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বৃহত্তর এশীয় কূটনীতি। মতপার্থক্য মিটিয়ে ভারত ও চিন যদি সত্যিই সহযোগিতার পথে এগোয়, তাহলে তার প্রভাব বাংলাদেশ, পাকিস্তান থেকে শুরু করে ওয়াশিংটনের কৌশলগত হিসাবেও পড়তে পারে। মোদি-জিনপিং বৈঠক তাই আঞ্চলিক কূটনীতির অন্যতম নজরকাড়া ঘটনা হতে চলেছে।



