১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারত এবং ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর বেজিং—দুই দেশই একেবারে ভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পথ বেছে নেয়। আজ তার ফলাফলও স্পষ্ট। বিশ্বব্যাঙ্কের ২০২৫ সালের হিসাবে চীনের মোট GDP প্রায় ১৯.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, ভারতের প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন। মাথাপিছু GDP-তেও ফারাক পাঁচ গুণের বেশি—চীনে প্রায় ১৩,৮৬২ ডলার, ভারতে ২,৭০৩ ডলার। প্রশ্নটা তাই স্বাভাবিক—এত বড় ব্যবধান তৈরি হল কীভাবে?
প্রথমেই অবশ্য একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হয়েছে, আর People’s Republic of China প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৪৯ সালে। অর্থাৎ দু’দেশের যাত্রা একই সময়ে শুরু হয়নি, তবে সময়ের ব্যবধান মাত্র দুই বছর। পরবর্তী সাত দশকে উন্নয়নের যে দুই ভিন্ন মডেল তৈরি হয়েছে, আজকের ব্যবধানের মূল কারণ খুঁজতে হলে সেই ইতিহাসের দিকেই তাকাতে হয়।
চীনের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলির একটি ছিল রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতা। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা একবার নেওয়ার পর সেটিকে দ্রুত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেজিংয়ের প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত কার্যকর ছিল। বিপুল পরিমাণ পরিকাঠামো, শিল্পাঞ্চল, বন্দর, বিদ্যুৎ উৎপাদন, রেল ও নগরায়ণ—সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের নেতৃত্বে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হয়েছে।
ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই বেশি জটিল। কেন্দ্র, রাজ্য, আদালত, স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ এবং নানা স্বার্থগোষ্ঠীর মতামতকে একসঙ্গে সামলাতে হয়। এই প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের শক্তি, কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কখনও কখনও তা সময়ও নেয়।
চীন জন্ম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রায় ৬০ কোটি লোকসংখ্যা কমিয়ে দিতে পেরেছে…প্রথমে দুই সন্তান নীতি তারপর এক সন্তান নীতি, সাম্যাবস্থা ফিরে এলে আবার দুই সংখ্যা নীতিতে ফিরে গেছে….কিন্তু আমরা করা তো দূর ভাবতেও পারিনি ( ব্যতিক্রম সঞ্জয় গান্ধী, শুধু এই কাজটি সময়ে ভাবার সাহস রাখার জন্য আমি মনে রাখবো এই নেতাকে )
ফলস্বরূপ অন্য ক্ষেত্রে সম্ভব না হলেও জনসংখ্যার নিরিখে আমরা এগিয়ে গেছি চীনের চেয়ে।
জনসংখ্যা রাষ্ট্রের যেমন শক্তি তেমনই দায়িত্ব…রাষ্ট্র কে বুঝে নিতে হয় কতটা পরিমাণ দায়িত্ব তারা গ্রহণ করতে পারবে কিংবা রাষ্ট্রের শক্তি হিসেবে ব্যবহারে লাগাতে পারবে।
আমরা এখনও সম্পূর্ণ দেশ কাঁটাতারে সুরক্ষিত করতে পারিনি ফলে অনুপ্রবেশ আমাদের অধিকার। প্রাকৃতিক সম্পদ সবের ওপর ভাগ বসাচ্ছে। দেশে সব মিলিয়ে এই সংখ্যা কয়েক কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা।
চীন কিন্তু ওদের সীমা সুরক্ষিত করেছে বহুযুগ ধর, ফলে আযচিত ভিড় ওখানে সেভাবে ঢুকতে পারেনি।
চীন, দুর্নীতি, ভ্রষ্টাচার, ঘুষখোরি , কালোবাজারি এসবের ওপর কঠিন আইন প্রণয়ন করেছে ফলে সেখানে কেউ এসব করার আগে নিজের জীবন এবং সম্পত্তির বাজি রেখে দিতে হবে। আমাদের এখানে তো হাজার হাজার কোটি টাকা সাবার করে দিব্যি কেসের পর কেস, তারিখের পর তারিখ বা বিদেশে পালিয়ে থাকা হামেশাই ঘটছে।
চীন নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি, নিজস্ব খাদ্যাভাস, নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেদের বহির্বিশ্বের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছে, আমরা ক্রমশ এবং ক্রমাগত নিজেদের উম্মুক্ত করে গেছি, তাই আমেরিকা ফেরত এক ছাত্র সোশ্যাল মিডিয়া মাধ্যমে রাষ্ট্রশক্তির বিপক্ষে আন্দোলন এখানে করতে পারে এবং সরকারের বিপক্ষে সেই আন্দোলন নির্ণায়ক জায়গা পর্যন্ত নিয়েও যেতে পারে।
আমাদের বিচারবিভাগ স্লথ, দীর্ঘসূত্রি এবং সেই কারণে কোটি কোটি কেস বিচারের অপেক্ষায়। চীন কিন্তু সঠিক সময়ের মধ্যে এই কাজ সম্পন্ন করে ফলে আইনের প্রতি ভরসা এবং আইনের শাসন সেখানে প্রতিষ্ঠিত।
চীন শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য নীতি প্রয়োজন ভিত্তিতে নিরন্তর পরিবর্তন করে। সময়ের সাথে সাথে যে শিক্ষা প্রয়োজন ছাত্র- ছাত্রী শুধু সেটাই জানবে বা পড়বে, আমাদের মতন যুগের পর যুগ “বাবার হলো আবার জ্বর” নিয়ে মেতে থাকবে না।
বাস্তবিক যে স্বাস্থ্য গ্রহণযোগ্য সেটাই ওরা প্রসারিত করেছে, সারা পৃথিবী যখন এলোপ্যাথি নিয়ে মেতেছে চীন সেই সঙ্গে নিজের ট্র্যাডিশনাল চিকিৎসা পদ্ধতিও একই রকম গুরুত্ব দিয়ে গেছে।
আমাদের মতন সেখানে লেবার ইউনিয়ন, ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক ইউনিয়ন, ডাক্তার ইউনিয়ন, প্রফেসর ইউনিয়ন এসব নেই। ফলে এসবের আড়ালে ক্রমাগত অসুবিধা তৈরীর বিকাশ কাজ থমকে দেওয়ার আবহ সেখানে তৈরি হয়নি।
আমাদের এখানে রাজনীতির স্বার্থে সংরক্ষন প্রাধান্য পায় মেধা নয়, আজ দেশে সর্বক্ষেত্রে অর্ধেকের বেশি আসন সংরক্ষিত থাকে ফলস্বরূপ অর্ধেক উৎকর্ষ প্রতিযোগিতার আগেই হেরে যায়। চীন এসবের ধারে কাছে নেই।
আমাদের দেশে রাজনীতির প্রয়োজনে ফেব্রিস বা ভাতা দেওয়ার প্রচলন ব্যাধির মত ছড়িয়ে পরেছে ফলে সরকারি কোষাগারের একটা বড় অংশ এই সামাজিক সুধারের নামে ব্যবহার হয় এবং সার্বিক উন্নতির ব্যাঘাত ঘটে, সেখানে চীন কর্মযোগ প্রাধান্য দিয়েছে আমরা ভক্তিযোগে আটকে আছি।
চীনে রাজনীতির মধ্যে গনতন্ত্র আর গনতন্ত্রের মধ্যে রাজনীতি নেই। সেখানে না এত এত রাজনৈতিক দল আছে আর না পর্যায়ক্রমে ক্ষমতার জন্য নির্বাচন আছে, না অধিকারের নামে স্বেচ্ছাচারিতা আছে। রাজনৈতীক স্থিরতা সেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বুলেট গতিতে বিকাশের অন্যতম একটা কারণ।
এসব কারণেই চীনের জিডিপি এবং পার ক্যাপিটা ইনকাম আমাদের পাঁচগুণ আর ভারতের ১% জনসংখ্যার কাছে দেশের ৪০% অর্থ আছে, দেশের প্রায় ৪০% যুবক-যুবতীর যোগ্যতা নিরিখে কাজ নেই আর প্রায় ৯ কোটি গ্র্যাজুয়েট কিছু করছে না জাস্ট বসে আছে।
তাই আজকের আসল প্রশ্ন, ‘চীনের মতো হব কি না’ নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—ভারত কীভাবে নিজের গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় রেখেই দ্রুত বিচার, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, manufacturing, কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াবে। কারণ ১৪৬ কোটির মানুষের দেশকে বোঝা নয়, শক্তিতে পরিণত করতে হলে জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তর করাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু ভারতের পথটা শেষ পর্যন্ত ভারতকেই তৈরি করতে হবে।
উত্তম পন্ডিত (শিক্ষক)



