কলকাতা: রাজ্যের অননুমোদিত ও নিয়মবহির্ভূত ভাবে চলা মাদ্রাসাগুলির বিরুদ্ধে বড় পদক্ষেপের পথে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যজুড়ে সমীক্ষা ও নথি যাচাইয়ের পর ২৫২টি মাদ্রাসাকে বন্ধের নোটিস দেওয়া হয়েছে। আরও প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব না মিললে ওই প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দফতরের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু।
সরকারি দফতরের তথ্য অনুযায়ী, কলকাতা-সহ রাজ্যের ২২টি জেলা থেকে মাদ্রাসাগুলির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সমীক্ষায় প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও রেজিস্ট্রেশন, পরিচালন ব্যবস্থা, পড়ুয়া ও শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা, পরিকাঠামো এবং অর্থের উৎসের মতো বিষয় খতিয়ে দেখা হয়।
সমীক্ষার রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, ২,১৩২টি মাদ্রাসা প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে চলছে, অন্যদিকে প্রায় ২,৩৯৬টি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সরকারি বা বোর্ডের রেজিস্ট্রেশন/অ্যাফিলিয়েশন নেই। এই দ্বিতীয় তালিকায় একাধিক খারিজি মাদ্রাসাও রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানানো হয়েছে।
তবে অনুমোদন না থাকা এবং বন্ধের নোটিস পাওয়া—দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই। ২,৩৯৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রথম দফায় ২৫২টির বিরুদ্ধে বন্ধের নোটিস এবং আরও ১০০টির কাছে শোকজ পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ, অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপটি ধাপে ধাপে এগোচ্ছে।
সমীক্ষার আগে রাজ্য প্রশাসন জেলা ধরে মাদ্রাসাগুলির বর্তমান পরিস্থিতির একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। জুনের সরকারি নির্দেশে স্বীকৃত, অনুমোদিত, অননুমোদিত, সাহায্যপ্রাপ্ত, সাহায্যবিহীন এবং বিভিন্ন ভাবে পরিচালিত মাদ্রাসাগুলির তথ্য সংগ্রহের কথা বলা হয়েছিল। সেই নির্দেশে শিক্ষার ধরন, পরিকাঠামো, পড়ুয়ার তথ্য এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক অবস্থাও যাচাই করার কথা ছিল।
পরবর্তী পর্যায়ে সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল রয়েছে কি না, তা দেখতে মাঠপর্যায়ে যাচাই করা হয়। প্রশাসনের দাবি, কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শ্রেণিকক্ষ বা অন্যান্য ন্যূনতম পরিকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। কোথাও শিক্ষক ও পড়ুয়ার সংখ্যাতেও অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
পাঠ্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের তরফে বলা হয়েছে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে রাজ্যের নির্ধারিত শিক্ষাক্রম থেকে উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি রয়েছে। এই ধরনের অনিয়ম, পরিকাঠামোর ঘাটতি এবং প্রশাসনিক নিয়ম না মানার অভিযোগের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রের বক্তব্য।
জেলাভিত্তিক হিসাবে মালদহে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মাদ্রাসার বিরুদ্ধে বন্ধের নোটিস দেওয়া হয়েছে—প্রায় ৪৪টি। এরপর উত্তর দিনাজপুরে প্রায় ৩৭টি, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় প্রায় ৩২টি, আর মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় প্রায় ২৫টি করে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
এই পদক্ষেপের কেন্দ্রে রয়েছে খারিজি মাদ্রাসাগুলিও। প্রশাসনিক ব্যাখ্যায়, খারিজি মাদ্রাসা বলতে এমন স্বতন্ত্র ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়, যেগুলি সাধারণত সরকারি আর্থিক সাহায্য বা আনুষ্ঠানিক সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিচালিত হয় এবং অনুদান বা ট্রাস্টের অর্থের উপর নির্ভর করতে পারে।
তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে ঘিরে সরকারের অভিযোগের একটি অংশ নিয়ে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। প্রশাসনের একাংশের দাবি, কয়েকটি খারিজি মাদ্রাসায় ‘ভারতবিরোধী’ শিক্ষা দেওয়া বা পড়ুয়াদের প্রভাবিত করার অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে। এই অভিযোগগুলি এখনও সাধারণ ভাবে সব খারিজি মাদ্রাসার ক্ষেত্রে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়। নির্দিষ্ট কোনও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ থাকলে তার প্রমাণের ভিত্তিতেই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডুর বক্তব্য, অনুমোদিত মাদ্রাসাগুলি নিয়ে সরকারের আপত্তি নেই। যে প্রতিষ্ঠানগুলি প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিয়ম মেনে চলছে, সেগুলি চালু থাকবে। অন্যদিকে, শোকজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের অবস্থান ও প্রয়োজনীয় নথি দিয়ে জবাব দিতে হবে। জবাব সন্তোষজনক না হলে তাদের বিরুদ্ধেও পরবর্তী পদক্ষেপ করা হতে পারে।
সরকারের যুক্তি, মাদ্রাসার পড়ুয়ারাও যাতে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের মতো আধুনিক ও মূলধারার শিক্ষার সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো, পাঠ্যক্রম এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে নিয়মের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে, মাদ্রাসা বন্ধের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তির কথাও সামনে এসেছে। ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকী প্রশ্ন তুলেছেন, কোন নির্দিষ্ট কারণে প্রতিষ্ঠানগুলিকে বন্ধ বা শোকজ করা হচ্ছে, তা সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে। তাঁর বক্তব্য, মাদ্রাসাগুলিতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সরকারি পাঠ্যক্রমও পড়ানো হয়।
অর্থাৎ, ২৫২টি মাদ্রাসার ক্ষেত্রে আপাতত বন্ধের নোটিস জারি হয়েছে; প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই স্থায়ী ভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে—এমনটা বলা ঠিক হবে না। একই ভাবে ১০০টি শোকজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও তাদের জবাব ও পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করছে।
সরকারি নির্দেশে শুরু হওয়া এই যাচাই প্রক্রিয়া এখানেই থামছে না। অনুমোদন, পরিকাঠামো, পাঠ্যক্রম এবং প্রশাসনিক নিয়মের ক্ষেত্রে কোথায় কী অনিয়ম রয়েছে, তা খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে দফতরের তরফে জানানো হয়েছে।



