কলকাতা/মেদিনীপুর: শালবনির সরকারি জমি সংক্রান্ত মামলায় সিআইডি (CID)-র চার্জশিটে উঠে এল প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরা এবং সুমিত রায়কে ঘিরে একাধিক দাবি। তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য, উদ্বাস্তুদের জন্য বরাদ্দ জমি নিয়ে কথিত অনিয়মের মাধ্যমে তৈরি অর্থের একটি অংশ সুমিত রায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া হত। এই দাবির পক্ষে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই প্রাক্তন দেহরক্ষী এবং সুজয় হাজরার গাড়িচালকের বয়ানের উল্লেখ রয়েছে চার্জশিটে।
২ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুরের আদালতে শালবনি জমি মামলায় ১৪ পাতার চার্জশিট জমা দেয় CID। সেখানে সুজয় হাজরা-সহ চার জনের নাম রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সুমিত রায়ের নাম ওই চার্জশিটে নেই। তাঁকে ঘিরে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে CID এবং প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত চার্জশিট দেওয়া হতে পারে।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, শালবনিতে যে জমি নিয়ে মামলা, তার সঙ্গে উদ্বাস্তুদের জন্য বরাদ্দ সরকারি জমির বিষয়টি যুক্ত। CID-এর অভিযোগ, জমির নথি নিয়ে কারচুপি করে সরকারি জমি বেআইনি ভাবে হাতবদলের প্রক্রিয়া চলেছিল। সেই জমি-লেনদেন থেকে তৈরি অর্থের একটি অংশ কোথায় যেত, তদন্তে সেটিই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
চার্জশিটে CID যে বয়ানগুলির উল্লেখ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই প্রাক্তন দেহরক্ষীর বক্তব্য। তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, ওই বয়ানগুলিতে বলা হয়েছে, সুজয় হাজরা কথিত জমি-লেনদেন থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ সুমিত রায়ের অফিসে পৌঁছে দিতেন। ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসে টাকা পৌঁছনোর কথাও তদন্তে উঠে এসেছে বলে CID-এর দাবি।
শুধু দুই প্রাক্তন দেহরক্ষী নন, সুজয় হাজরার গাড়িচালকের বয়ানও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখিয়েছে CID। পাশাপাশি দুই ব্যবসায়ী এবং এক মধ্যস্থতাকারীর বক্তব্যেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গিয়েছে বলে চার্জশিটে তদন্তকারী সংস্থার দাবি।
মামলাটির আর্থিক দিকও তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে। সাম্প্রতিক আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে রাজ্যের তরফে দাবি করা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সুমিত রায়ের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে প্রায় ১৫ কোটি টাকার লেনদেনের হদিস মিলেছে। সেই অর্থের উৎস কী, তার সঙ্গে শালবনির জমি-লেনদেনের কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।
এর আগে সুজয় হাজরাকে গ্রেফতার করে CID। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়ই সুমিত রায়ের নাম তদন্তে সামনে আসে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সুমিতের বিরুদ্ধেও তদন্ত এগোয়। তবে তাঁর নাম মূল চার্জশিটে না থাকায় এই মুহূর্তে তাঁকে নিয়ে তদন্তের আইনি অবস্থান আলাদা।
সুমিত রায়ের ক্ষেত্রে তদন্ত আরও এক ধাপ এগোয় সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে। সুপ্রিম কোর্ট তাঁর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করার পর CID তাঁকে গ্রেফতার করে। পরে মেদিনীপুরের আদালত তাঁকে আট দিনের CID হেফাজতে পাঠায়। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, জমি-লেনদেন এবং আর্থিক গতিপথ সম্পর্কে আরও তথ্য পেতেই তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
তবে এই মামলায় একটি বিষয় আলাদা করে মনে রাখা জরুরি। চার্জশিটে যে বয়ান বা তদন্তের দাবি রয়েছে, সেগুলি এখনও আদালতে চূড়ান্ত ভাবে প্রমাণিত নয়। সুমিত রায়ের আইনজীবী আগেই তদন্তের পদ্ধতি এবং তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। ফলে CID-এর চার্জশিটে থাকা বক্তব্যকে অভিযোগ ও তদন্তকারীদের দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত অপরাধ হিসেবে নয়।
শালবনি মামলায় এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে কথিত জমি-লেনদেনের টাকা কোন পথে গিয়েছে এবং সেই অর্থের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন। সুমিত রায়কে হেফাজতে নিয়ে CID-এর জিজ্ঞাসাবাদে সেই আর্থিক যোগসূত্রের আরও তথ্য সামনে আসে কি না, সেটাই তদন্তের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।



