২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বামফ্রন্টের প্রথম প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরই নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। মোট ১৯২টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও নজর কেড়েছে দুটি কেন্দ্র—মুর্শিদাবাদের রানিনগর এবং কলকাতার টালিগঞ্জ। বিশেষ করে রানিনগর সেই কেন্দ্র যেখানে গত লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে একমাত্র সিপিএম এগিয়ে ছিল। অথচ সেই কেন্দ্রেই প্রার্থী ঘোষণা না করায় প্রশ্ন উঠেছে—দলের অন্দরের কৌশলগত সমীকরণেই কি আটকে রয়েছে এই সিদ্ধান্ত?
গত লোকসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ কেন্দ্রে সিপিএমের প্রার্থী ছিলেন দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে একমাত্র রানিনগরেই তিনি এগিয়ে ছিলেন, যদিও ব্যবধান ছিল হাজার ভোটেরও কম। সেই কারণেই রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা চলছিল, বিধানসভা নির্বাচনে রানিনগর থেকেই লড়তে পারেন সেলিম। কিন্তু প্রথম প্রার্থী তালিকায় রানিনগরের নাম না থাকায় নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সিপিএম সূত্রে জানা যাচ্ছে, দল নীতিগত ভাবে ঠিক করেছে—রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যদের মধ্যে এ বার বিধানসভা নির্বাচনে একমাত্র মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়-ই লড়বেন। তিনি প্রার্থী হচ্ছেন হুগলির উত্তরপাড়া কেন্দ্র থেকে। তবে বাঁকুড়ার রানিবাঁধে জেলা নেতৃত্বের অনুরোধে দেবলীনা হেমব্রম-কে বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য। এই নীতিগত সিদ্ধান্তের জটেই আপাতত রানিনগরের প্রার্থী ঘোষণা আটকে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
দলের একাংশের মতে, রানিনগরের মতো আসনে জয় পেতে গেলে সেলিমের মতো ‘ওজনদার’ প্রার্থী দরকার। কিন্তু সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যদের নির্বাচনে না লড়ার নীতি কার্যকর থাকায় তাঁর নাম ঘোষণায় দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
এই জটের সঙ্গেই জুড়ে যাচ্ছে টালিগঞ্জ কেন্দ্রের প্রসঙ্গ। সূত্রের খবর, ওই আসনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী-কে। তবে তিনি নাকি ইতিমধ্যেই দলীয় নেতৃত্বকে জানিয়েছেন যে তিনি নির্বাচনে লড়তে আগ্রহী নন, বরং সংগঠন ও প্রচারের কাজেই থাকতে চান।
সুজন চক্রবর্তী সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীরও সদস্য। অতীতে তাঁকে একাধিক আসনে প্রার্থী করা হয়েছে—বিধানসভায় যাদবপুর এবং লোকসভায় দমদমে। ফলে আবার নতুন আসনে লড়ার প্রস্তাব নিয়ে দলের ভিতরেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি শেষ পর্যন্ত সুজন চক্রবর্তী টালিগঞ্জ থেকে প্রার্থী হতে রাজি হন, তা হলে সেলিমের রানিনগর থেকে লড়ার পথও কিছুটা সহজ হতে পারে। তবে তা না হলে সম্পাদকমণ্ডলীর নীতিগত সিদ্ধান্তই শেষ কথা হবে কি না, সেই প্রশ্নও রয়ে গেছে।
এদিকে বামফ্রন্টের প্রথম তালিকায় কিছু সিদ্ধান্ত ঘিরে দলের ভিতরেও আলোচনা শুরু হয়েছে। যেমন—যাদবপুরে বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য, ইংরেজবাজারে অম্বর মিত্র বা প্রবীণ নেতা মানস মুখোপাধ্যায়-দের প্রার্থী করা নিয়ে দলের একাংশ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতাদের সামনে আনা দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, তরুণ নেতা কলতান দাশগুপ্ত-কে উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি থেকে প্রার্থী করা নিয়েও বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বামফ্রন্টের শরিক দলগুলির মধ্যেও কিছু অসন্তোষের সুর শোনা গিয়েছে। ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা নরেন চট্টোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু-কে চিঠি লিখে অভিযোগ জানিয়েছেন যে কলকাতার শ্যামপুকুর আসনে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সত্ত্বেও তাদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা হয়নি। পাশাপাশি কোচবিহার উত্তর, জলপাইগুড়ি, হরিশচন্দ্রপুর ও গলসি নিয়েও আপত্তি তুলেছে দলটি।
সব মিলিয়ে বামফ্রন্টের প্রথম প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরই স্পষ্ট হয়েছে—২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাম রাজনীতির অন্দরে কৌশলগত সমীকরণ এখনও পুরোপুরি মেলেনি।



