নজরবন্দি ব্যুরো: মসজিদের লাউডস্পিকার খুলে দেওয়ার প্রতিবাদে মিছিল করার অনুমতি মিলল কলকাতা হাই কোর্টে, তবে থাকল একাধিক কড়া শর্ত। সোমবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের (Sougata Bhattacharyya) এজলাসে শুনানির পর রাজাবাজার থেকে মৌলালি পর্যন্ত মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ ৭৫০ জন অংশ নিতে পারবেন, সকাল সাড়ে ১১টায় মিছিল শুরু করে এক ঘণ্টার মধ্যে তা শেষ করতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত—মিছিলে কোনও মাইক বা লাউডস্পিকার ব্যবহার করা যাবে না।
১১ অগস্ট এই মিছিলের অনুমতি চেয়ে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল একটি সংগঠন। ধর্মীয় স্থান থেকে লাউডস্পিকার সরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদেই কর্মসূচির আয়োজন করতে চাওয়া হয়েছিল। সোমবার সকালে মামলাটি বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে উল্লেখ করেন আইনজীবী সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায় (Sabyasachi Chattopadhyay)।
শুনানিতে পুলিশের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, ৩ অগস্ট মিছিলের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল, অথচ শুক্রবার রাতে পুলিশ জানায় যে অনুমতি দেওয়া হবে না। আগে থেকেই বিষয়টি জানানো যেত বলে মন্তব্য করেন বিচারপতি।
রাজ্যের তরফে অবশ্য মিছিলের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়। রাজ্যের আইনজীবী এজি সুরজিত মিত্র জানান, মামলাকারীদের তরফে কিছু তথ্য গোপন করা হয়েছে। সপ্তাহের মাঝখানে এই ধরনের মিছিলের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয় বলেও আদালতে জানানো হয়।
রাজ্যের প্রস্তাব ছিল, ২ হাজার মানুষের বদলে সর্বোচ্চ ৩০০ জনকে নিয়ে মিছিল করার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। গড়িয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে এসসি মল্লিক রোড হয়ে ইএম বাইপাস পর্যন্ত অন্য একটি রুটের কথাও আদালতে জানানো হয়।
মামলাকারীর আইনজীবী পাল্টা জানান, মিছিলের অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমাতে তাঁরা প্রস্তুত। পুলিশ চাইলে রবিবার কর্মসূচি করার কথাও জানাতে পারত বলে তাঁর যুক্তি। অর্থাৎ পুলিশের আপত্তির কারণ এবং মিছিলের রুট নিয়ে আলোচনার সুযোগ ছিল বলেই আদালতে দাবি করেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত আদালত রাজাবাজার থেকে মৌলালি পর্যন্ত মিছিলের অনুমতি দেয়। তবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৭৫০-এর মধ্যে রাখতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মসূচি শেষ করতে হবে এবং কোনও ধরনের মাইক, লাউডস্পিকার বা শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না।
মসজিদে লাউডস্পিকার বন্ধ করা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই রাজ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। প্রশাসনের দাবি, এই অভিযান কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নয়। নির্ধারিত শব্দসীমা এবং আদালতের নির্দেশ মেনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির লাউডস্পিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ম কার্যকর করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক অভিযানে মসজিদ এবং মন্দির—দুই ধরনের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকেই লাউডস্পিকার সরানোর তথ্য সামনে এসেছে। একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মাত্র দু’দিনের অভিযানে প্রায় ১,৫০০ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের লাউডস্পিকার সরানো বা খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ১,২৭৯টি মসজিদ এবং ১৯৯টি মন্দির ছিল।
রাজ্য সরকারের বক্তব্য, এই পদক্ষেপের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের কোনও সম্পর্ক নেই; মূল লক্ষ্য শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং আদালতের নির্দেশ কার্যকর করা। অন্যদিকে, মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার খোলার ঘটনায় আপত্তি জানিয়ে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, ধর্মীয় উপাসনার সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘদিনের ব্যবস্থায় হঠাৎ হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই প্রতিবাদ মিছিলের অনুমতি দিয়েছে আদালত। ফলে একদিকে প্রতিবাদের সাংবিধানিক অধিকার বজায় থাকল, অন্যদিকে মিছিলের মধ্যেও শব্দবর্ধক যন্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হল না। আদালতের এই শর্তই এখন সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর আগে কলকাতা হাই কোর্ট বিভিন্ন মিছিল ও সমাবেশের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা, যান চলাচল এবং জননিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে একাধিক শর্ত আরোপ করেছে। র্যালির আয়োজকদের দায়িত্ব এবং পুলিশের অনুমতির প্রক্রিয়া নিয়েও আদালত একাধিকবার নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছে।
ফলে ১১ অগস্টের এই মিছিল ঘিরে এখন নজর থাকবে তিনটি বিষয়ের উপর—নির্ধারিত ৭৫০ জনের সীমা মানা হচ্ছে কি না, সকাল সাড়ে ১১টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে কর্মসূচি শেষ হচ্ছে কি না এবং সবচেয়ে বড় কথা, আদালতের নির্দেশ মেনে মাইক বা লাউডস্পিকার ছাড়াই মিছিল হচ্ছে কি না। আদালতের অনুমতিতে প্রতিবাদের পথ খুললেও শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে কোনও ছাড় দেওয়া হয়নি, সোমবারের নির্দেশে সেটিই স্পষ্ট হয়ে গেল।



