নজরবন্দি ব্যুরো: হালিশহরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়িতে হামলার অভিযোগের প্রতিবাদে সোমবার বিধানসভা চত্বরে তৃণমূলের দুই শিবিরকে কার্যত একই সারিতে দেখা গেল। কুণাল ঘোষ, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়দের সঙ্গে বিক্ষোভে যোগ দিলেন ঋতব্রতপন্থী তিন বিধায়ক—খালেক মোল্লা, তৌসিফুর রহমান এবং বিভাস সর্দার। বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে মমতার পাশে তাঁদের এই অবস্থান ঘিরেই এবার তৃণমূলের অন্দরে নতুন সমীকরণের প্রশ্ন উঠেছে।
রবিবার উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে মৃত তৃণমূল কর্মী বিরজু কেওটের বাড়িতে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। সেখানে তাঁর কনভয় বিক্ষোভের মুখে পড়ে। মমতার অভিযোগ, তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে জল, কাদা, জুতো এবং পাথর ছোড়া হয়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে।
বিরজু কেওটের মৃত্যুকে ঘিরেই হালিশহরে উত্তেজনার সূত্রপাত। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ হেফাজতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য, তাঁকে লকআপে অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। শুক্রবার রাতে কাঁচরাপাড়ার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বিরজুকে গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজি এবং মারামারির অভিযোগ ছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।
পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রেফতারের পর বিরজুর মেডিক্যাল পরীক্ষা হয় এবং সন্ধ্যায় তাঁর স্ত্রী জেলেও দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি সুস্থ ছিলেন বলেই পরিবারের দাবি। পরে পুলিশ হেফাজতে তাঁর মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
এই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতেই রবিবার হালিশহরে গিয়েছিলেন মমতা। মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পথে তাঁর গাড়ি বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে পড়ে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং মমতার কনভয়কে লক্ষ্য করে বিভিন্ন জিনিস ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার তীব্র নিন্দা করে মমতা বিজেপিকে নিশানা করেন।
এই ঘটনার পর সোমবার বিধানসভা চত্বরে প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করে কালীঘাট তৃণমূলের নেতৃত্ব। হাতে বিজেপি-বিরোধী পোস্টার নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক বিধায়ক ও নেতা।
কিন্তু নজর কেড়ে নেয় অন্য একটি বিষয়। এই বিক্ষোভেই কালীঘাট নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা যায় ঋতব্রতপন্থী বলে পরিচিত তিন বিধায়ককে। খিদিরপুরের বিধায়ক আবদুল খালেক মোল্লা, বসিরহাট উত্তরের বিধায়ক তৌসিফুর রহমান এবং বারুইপুর পূর্বের বিধায়ক বিভাস সর্দার মমতার উপর হামলার প্রতিবাদে পোস্টার হাতে বিক্ষোভে অংশ নেন। এই উপস্থিতির ছবি প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
কারণ, তৃণমূলের অন্দরে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee)-এর নেতৃত্বাধীন অংশের সঙ্গে কালীঘাট নেতৃত্বের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে মমতার উপর হামলার প্রতিবাদে দুই পক্ষের নেতাদের একই কর্মসূচিতে পাশাপাশি দাঁড়ানোকে অনেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
তাহলে কি ঋতব্রত শিবিরে ভাঙনের ইঙ্গিত? নাকি নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক ঘটনায় মমতার পাশে দাঁড়ানোকে বৃহত্তর সাংগঠনিক সমীকরণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা ঠিক হবে না? আপাতত এই প্রশ্নের কোনও নিশ্চিত উত্তর নেই। তিন বিধায়কের এই কর্মসূচিতে যোগদানকে সরাসরি শিবির বদলের প্রমাণ হিসেবেও দেখার সুযোগ নেই।
এর পিছনে রয়েছে তৃণমূলের নেতৃত্ব নিয়ে আগের বিতর্কও। ঋতব্রতপন্থী অংশের তরফে অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের পরামর্শদাতা হিসেবে রাখার প্রস্তাব সামনে এসেছিল। অর্থাৎ তাঁকে সক্রিয় নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে একটি পরামর্শদাতার ভূমিকায় রাখার ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই অবস্থানের সঙ্গে বর্তমান প্রতিবাদ কর্মসূচিতে মমতার পাশে দাঁড়ানোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা নিয়েই এখন জল্পনা।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—মমতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তাঁর উপর হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের দুই ভিন্ন শিবিরের বিধায়কদের একসঙ্গে দেখা গেল। দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মধ্যেও ‘নেত্রী’ হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে একটি অভিন্ন অবস্থান এখনও রয়েছে কি না, সোমবারের বিধানসভা চত্বরের ছবিই সেই প্রশ্নকে সামনে এনে দিল।
হালিশহরের ঘটনার রাজনৈতিক অভিঘাত আগামী দিনে কতটা দূর গড়ায়, সেটাই এখন দেখার। বিশেষ করে ঋতব্রতপন্থী তিন বিধায়কের এই অবস্থান কি শুধুই একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তৃণমূলের অন্দরের সমীকরণে তার কোনও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে—সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



