নজরবন্দি ব্যুরো: তামিল ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে বড় বার্তা দিলেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয় (C Joseph Vijay)। সোমবার বিধানসভায় সর্বসম্মত ভাবে পাশ হল ‘তামিল থাই ভাজথু’ (Tamil Thai Vazhthu)-কে রাজ্যের সরকারি অনুষ্ঠানগুলিতে প্রথমে গাওয়ার প্রস্তাব। সরকারি দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানের শুরুতেই রাজ্য সঙ্গীত গাওয়ার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে বিরোধী ডিএমকে (DMK), এআইএডিএমকে (AIADMK)-সহ একাধিক দল।
প্রস্তাব পেশ করে বিজয় স্পষ্ট করে দেন, তামিল ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদার প্রশ্নে তাঁর সরকার কোনও আপস করবে না। তাঁর বক্তব্য, তামিল শুধুমাত্র একটি ভাষা নয়, মানুষের জীবন, আবেগ এবং পরিচয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। মাতৃভাষার প্রতি সম্মান দেখানোকে তিনি তামিলনাড়ুর সাংস্কৃতিক অধিকারের অংশ হিসেবেই তুলে ধরেন।
বিজয়ের যুক্তি, ‘তামিল থাই ভাজথু’কে অনুষ্ঠানের শুরুতে রাখা কোনওভাবেই জাতীয় ঐক্য বা দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর বিরোধিতা নয়। বরং ভারতের ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’-এর ধারণার সঙ্গেই এর সামঞ্জস্য রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, তামিলনাড়ুর নিজস্ব রাজ্য সঙ্গীতকে সরকারি অনুষ্ঠানে প্রথম স্থান দেওয়ার অধিকার কি রাজ্যের নেই?
সোমবারের প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজ্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি দপ্তর, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানের শুরুতেই ‘তামিল থাই ভাজথু’ গাওয়ার নিয়ম বহাল থাকবে। বিধানসভার স্পিকার জেসি ডি প্রভাকর (J. C. D. Prabhakar) জানান, প্রস্তাবটি সর্বসম্মত ভাবে পাশ হয়েছে এবং এটি কার্যকর করার জন্য অন্য কোনও অনুমতির প্রয়োজন নেই।
‘তামিল থাই ভাজথু’-র ইতিহাসও দীর্ঘ। মানোনমণিয়াম সুন্দরনারের (Manonmaniam Sundaranar) ১৮৯১ সালের নাটক ‘মানোনমণিয়াম’ থেকে গানটি নেওয়া হয়েছে। ১৯৭০ সালের ২৩ নভেম্বরের সরকারি নির্দেশের পর থেকেই তামিলনাড়ুর সরকারি অনুষ্ঠানের শুরুতে এই গান গাওয়ার প্রথা চলে আসছে। ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর এটিকে আনুষ্ঠানিক ভাবে রাজ্যের State Song হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
তবে সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রপাত কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা ঘিরে। জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ (Vande Mataram) এবং জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’ (Jana Gana Mana) পরিবেশনের ক্রম নিয়ে নির্দেশিকা জারি হয়। ৯ জুলাইয়ের চিঠিতে কেন্দ্র স্পষ্ট করে, যখন জাতীয় গান ও জাতীয় সঙ্গীত দু’টিই পরিবেশিত হবে, তখন ‘বন্দে মাতরম’ আগে এবং ‘জন গণ মন’ পরে হবে।
এই নির্দেশিকা ঘিরেই তামিলনাড়ুতে প্রশ্ন ওঠে রাজ্য সঙ্গীতের অবস্থান নিয়ে। কারণ রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ‘তামিল থাই ভাজথু’ অনুষ্ঠান শুরুর আগে গাওয়ার রীতি রয়েছে। এর আগে জুলাইয়ের শেষদিকে মণোন্মণিয়াম সুন্দরনার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘জন গণ মন’-এর পরে ‘তামিল থাই ভাজথু’ গাওয়াকে কেন্দ্র করেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
তবে এখানে কেন্দ্রের অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ৯ জুলাইয়ের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের clarification-এ বলা হয়, যে রাজ্যে নিজস্ব State Song রয়েছে, সেখানে সেটি আগে গাওয়া বা বাজানো হবে; তার পরে ‘বন্দে মাতরম’ এবং শেষে ‘জন গণ মন’। অর্থাৎ চূড়ান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাখ্যায় ক্রমটি হল State Song → National Song → National Anthem।
এই কারণেই সোমবারের তামিলনাড়ু বিধানসভার প্রস্তাবকে কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত হিসেবে দেখার আগে এই পরবর্তী clarification-টিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বরং বিধানসভার প্রস্তাবটি রাজ্যে বহু দশক ধরে চলে আসা ‘তামিল থাই ভাজথু’ প্রথমে গাওয়ার প্রথাকে আরও স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিল।
বিজয়ের প্রস্তাব অবশ্য শুধু তাঁর দল তামিলাগা ভেট্রি কাজাগমের (Tamilaga Vettri Kazhagam) সমর্থনেই পাশ হয়নি। ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-সহ বিরোধী দলগুলিও এর পাশে দাঁড়িয়েছে। এআইএডিএমকে নেতা এডাপ্পাদি কে পালানিস্বামী (Edappadi K Palaniswami) বলেন, রাজ্য সঙ্গীত গাওয়া কারও বিরুদ্ধে নয়, বরং মাতৃভাষার প্রতি সম্মানের প্রকাশ। ডিএমকেও প্রস্তাবকে সমর্থন করে বিষয়টি আইনি ভাবে আরও শক্তিশালী করার দাবি তুলেছে।
ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে তামিল ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্নে তামিলনাড়ু বিধানসভায় কার্যত এক বিরল ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। বিজয়ও বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর সরকারের কাছে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্ন শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।
এখন নজর থাকবে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের দিকে। কারণ বিধানসভা স্পষ্ট করে দিয়েছে—রাজ্যের সরকারি অনুষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ‘তামিল থাই ভাজথু’ প্রথমেই গাওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে আলাদা অনুমতির প্রয়োজন নেই। ফলে তামিলনাড়ুর প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে রাজ্য সঙ্গীতের মর্যাদা আরও এক ধাপ বাড়ল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।



