বাংলার ধর্মীয় পরম্পরা ও ঐতিহ্য রক্ষার বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে ‘রাম শরদ কোঠারি প্রতিভা সম্মান’ প্রদান অনুষ্ঠানে একাধিক বিষয়ে বক্তব্য রাখেন তিনি। দুর্গাপুজোর আচার থেকে শুরু করে ধর্মীয় ঐতিহ্য, বৃক্ষরোপণ, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা UCC—সব ক্ষেত্রেই নিজের সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন মুখ্যমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের প্রসঙ্গও টানেন শুভেন্দু। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি রসিকতার সুরে জানান, উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে বাংলারও প্রতিযোগিতা হবে। একইসঙ্গে ‘দেশবিরোধী শক্তি’র বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথাও বলেন তিনি।
রাম-শরদ কোঠারির নামে বাংলায় উদ্যোগের বার্তা
১৯৯০ সালের রাম জন্মভূমি আন্দোলনের সময় অযোধ্যায় করসেবা করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন বাংলার দুই ভাই রাম কোঠারি ও শরদ কোঠারি। তাঁদের স্মরণে বাংলাতেও রাস্তা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরস্কার চালুর পক্ষে সওয়াল করেন শুভেন্দু।
তাঁর বক্তব্য, লখনৌতে রাম ও শরদ কোঠারির নামে রাস্তা থাকলেও বাংলায় তাঁদের স্মরণে তেমন উদ্যোগ হয়নি। তাই তাঁদের নামে বাংলায় রাস্তা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুরস্কার চালুর প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি।
পুজোর উদ্বোধন ও বিসর্জন নিয়েও বার্তা
দুর্গাপুজোর আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও পরম্পরা মেনে চলার উপর জোর দেন মুখ্যমন্ত্রী। পিতৃপক্ষে পুজোর উদ্বোধন করা যাবে না, মাতৃপক্ষেই তা করতে হবে—এই অবস্থানের কথা জানান তিনি।
এর আগে দুর্গাপুজো নিয়ে রাজ্য সরকারের বৈঠকেও মহালয়ার আগে পুজোর উদ্বোধন না করার নির্দেশের কথা জানানো হয়েছিল। সরকারি নির্দেশনায় পুজোর ঐতিহ্য ও ধর্মীয় পরম্পরা বজায় রাখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিসর্জনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কথা বলেছেন শুভেন্দু। প্রতিমা বিসর্জনের সময় ক্রেন ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত আগেই জানিয়েছে রাজ্য সরকার। এর পরিবর্তে কীভাবে প্রতিমা বিসর্জন করা হবে, তা নিয়ে কলকাতা পুরসভাকে বিকল্প ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে হচ্ছে।
‘মায়ের নামে একটি গাছ’, যোগীর সঙ্গে ‘কম্পিটিশন’
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘মায়ের নামে একটি গাছ’ কর্মসূচির প্রসঙ্গও উঠে আসে শুভেন্দুর বক্তব্যে। তাঁর দাবি, এই কর্মসূচির আওতায় উত্তরপ্রদেশে ২৬ কোটি গাছ লাগানো হচ্ছে। বাংলাতেও ১০ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নেওয়ার কথা জানান তিনি।
এই প্রসঙ্গেই যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গে তাঁর ‘কম্পিটিশন’ চলছে বলে মন্তব্য করেন শুভেন্দু। রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণকে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার কথাও বলেন তিনি।
UCC নিয়ে তিন-চার মাসের ইঙ্গিত
অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা UCC নিয়েও বড় দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ নিয়ে কমিশন কাজ করছে এবং আরও তিন-চার মাস সময় লাগতে পারে। এরপর রাজ্যে UCC কার্যকর করা হবে বলে জানান তিনি।
তবে UCC কার্যকর হওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে তাঁর ঘোষিত পরিকল্পনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বাস্তবে কোনও আইন বা বিধি কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সরকারি ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
‘কোনও সন্তের অপমান হতে দেব না’
বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রীকে ঘিরে অতীতে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রসঙ্গও তোলেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, বাংলায় কোনও সন্তের অপমান হতে দেওয়া হবে না।
এদিনের বক্তব্যে সামগ্রিকভাবে বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। দুর্গাপুজোর আচার থেকে প্রতিমা বিসর্জন, রাম কোঠারি-শরদ কোঠারির স্মরণ এবং UCC—একাধিক বিষয়েই তাঁর বক্তব্যে ঐতিহ্য ও ধর্মীয় পরম্পরার উপর জোর দিতে দেখা যায়। দুর্গাপুজো নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশনাতেও পুজোর ঐতিহ্য, মহালয়ার পর উদ্বোধন এবং বিসর্জনের নিয়ম মেনে চলার বিষয়টি সামনে এসেছে।



