নজরবন্দি ব্যুরো: হালিশহরে পুলিশি হেফাজতে মৃত তৃণমূল কর্মী বিরজু কেওটের পরিবারের জন্য ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য এবং চাকরির ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। সেই সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেও এবার আরজি করের প্রসঙ্গ টেনে পাল্টা রাজনৈতিক প্রশ্ন তুললেন তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ (Kunal Ghosh)। তাঁর বক্তব্য, আজ সরকারি সাহায্য দেওয়াকে যদি সঠিক সিদ্ধান্ত বলা হয়, তাহলে আরজি করের সময় একই ধরনের আর্থিক সাহায্য নিয়ে কেন ‘ঘুষ’ ও ‘মুখ বন্ধের টাকা’ বলে প্রচার হয়েছিল?
হালিশহরে বিরজু কেওটের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরেই রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ হেফাজতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। যদিও পুলিশের বক্তব্য, লকআপে অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে পাওয়া গিয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে মৃতের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে আর্থিক সাহায্যের কথা ঘোষণা করেন শুভেন্দু।
সেই ঘোষণার পরেই সমাজমাধ্যমে নিজের অবস্থান জানান কুণাল। তাঁর বক্তব্য, সরকারি নিয়ম মেনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করা হলে তাতে আপত্তির কিছু নেই। বরং তাঁর মতে, বিরজুর পরিবারের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিতই হয়েছে।
কিন্তু এখানেই আরজি করের প্রসঙ্গ সামনে আনেন তৃণমূল নেতা। কুণালের দাবি, আরজি কর-কাণ্ডের পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য আর্থিক সাহায্যের কথা বলায় তাঁকে ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনা হয়েছিল।
কুণালের অভিযোগ, সেই সময় সরকারি ক্ষতিপূরণকে ‘ঘুষ’ কিংবা ‘মুখ বন্ধ করার জন্য টাকা’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। তাঁর প্রশ্ন, যদি কোনও পরিবারকে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা দেওয়া গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে একই পদক্ষেপের ক্ষেত্রে অতীতে এত বিতর্ক তৈরি করা হয়েছিল কেন?
নিজের পোস্টে কুণাল আরও দাবি করেছেন, তাঁদের পক্ষ থেকে তখনও বলা হয়েছিল—টাকা দিয়ে কোনও মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়, কিন্তু সরকারের একটি প্রশাসনিক দায় থাকে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ধরনের ঘটনায় ক্ষতিপূরণের জন্য সরকারি কাঠামো ও নির্দিষ্ট আর্থিক ব্যবস্থাও থাকে।
আরজি করের সময় এই অবস্থান নিয়ে যে সমালোচনা হয়েছিল, সেটিকেই এবার হালিশহরের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন কুণাল। তাঁর বক্তব্য, তখন সরকারি ক্ষতিপূরণের সিদ্ধান্তকে যে ভাবে রাজনৈতিক ভাবে আক্রমণ করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই একই যুক্তি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
এদিন কুণাল নিজের পোস্টে আরও দাবি করেন, সেই সময় এমনকি চিকিৎসকদের একটি সংগঠনের তরফেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সরকারি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করা হয়েছিল। যদিও তাঁর বক্তব্যের এই অংশটি তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতেই সামনে এনেছেন।
হালিশহরের ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে। বিরজু কেওটের মৃত্যুর কারণ, পুলিশ হেফাজতে তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল এবং পরিবারের অভিযোগের সত্যতা—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। তার মধ্যেই আর্থিক সাহায্যকে কেন্দ্র করে পুরনো আরজি কর বিতর্ক সামনে এনে কুণালের এই মন্তব্য নতুন রাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে।
তবে কুণালের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য শুধু শুভেন্দুর সিদ্ধান্তের সমালোচনা নয়। বরং বর্তমান সরকারের একটি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েই তিনি অতীতের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে তুলনা টানতে চেয়েছেন। তাঁর যুক্তি, সরকারি ক্ষতিপূরণ যদি আজ ‘কর্তব্য’ হয়, তাহলে অতীতেও একই বিষয়কে সেই দৃষ্টিতেই দেখা উচিত ছিল।
ফলে হালিশহরে ১০ লক্ষ টাকা সাহায্যের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে এখন শুধু বিরজু কেওটের পরিবারের পাশে সরকারের দাঁড়ানোই আলোচনায় নেই। তার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে আরজি করের সময়ের ক্ষতিপূরণ-বিতর্কও। কুণাল ঘোষের এই রাজনৈতিক খোঁচার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসে কি না, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



