নজরবন্দি ব্যুরো: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে ফের বড়সড় ড্রোন হামলায় কেঁপে উঠল রাশিয়ার মাটি। তাতারস্তানের শিল্পনগরী নিজনেকামস্কে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু এবং ৭৫ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। হামলার পর তেল শোধনাগার এলাকা থেকে বিশাল কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। ঘটনাটিকে চলতি যুদ্ধে রাশিয়ার মাটিতে ইউক্রেনের অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হামলার কেন্দ্র ছিল তাতারস্তানের নিজনেকামস্ক, ইউক্রেনীয় সীমান্ত থেকে বহু দূরে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। শহরটি রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্র। ইউক্রেনের হামলার লক্ষ্য ছিল তাতনেফট (Tatneft)-এর সঙ্গে যুক্ত তানেকো (TANECO) তেল শোধনাগার বলে ইউক্রেনীয় পক্ষ দাবি করেছে।
হামলার পর শোধনাগার এলাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে শিল্পাঞ্চলের উপর ঘন কালো ধোঁয়ার বিশাল স্তম্ভ দেখা গিয়েছে। তবে ওই ভিডিওগুলির প্রত্যেকটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। রুশ কর্তৃপক্ষও হামলার নির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্পর্কে সব তথ্য প্রকাশ করেনি।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দাবি, রাতভর দেশের বিভিন্ন এলাকায় মোট ৪৫৬টি ইউক্রেনীয় ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিহত করা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক ড্রোন হামলা দেখিয়ে দিচ্ছে, রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার আক্রমণ চালানোর ক্ষেত্রে ইউক্রেন ক্রমশ তাদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
নিজনেকামস্কের তানেকো শোধনাগার এর আগেও ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার লক্ষ্য হয়েছে। ফলে সোমবারের হামলাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না পর্যবেক্ষকরা। রাশিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে ইউক্রেনের ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ হিসেবেই এই হামলাকে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, একই সময়ে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভও রুশ হামলার মুখে পড়েছে। তবে এখানে একটি সময়গত বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—৭৪টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৪৯৬টি ড্রোনের যে সংখ্যা সামনে এসেছে, সেটি ২ জুলাই কিয়েভে রাশিয়ার চালানো ব্যাপক হামলার হিসাব, সোমবারের হামলার নয়। সেই হামলায় কিয়েভে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এবং বহু মানুষ হতাহত হন।
সাম্প্রতিক দিনগুলিতেও রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের ভূখণ্ডে ধারাবাহিক আকাশ হামলা চালিয়েছে। ৮ অগস্ট কিয়েভ অঞ্চলে রুশ ড্রোন হামলায় তিন বছরের একটি শিশু এবং তার দুই দাদু-দিদার মৃত্যু হয়েছিল বলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি (Volodymyr Zelenskyy) জানিয়েছিলেন। একই সময়ে ইউক্রেনও রাশিয়ার তেল পরিশোধনাগার ও জ্বালানি পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে।
এরই মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের আরও একটি পাল্টা আক্রমণের খবর সামনে এসেছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়ার হামলায় খারকিভ (Kharkiv) অঞ্চলেও প্রাণহানি হয়েছে। ৯ অগস্টের হামলা নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন দু’পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী আক্রমণের অভিযোগ তুলেছে।
চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে এখন সীমান্তের কাছাকাছি সামরিক ঘাঁটি বা যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি দেশের গভীরে থাকা জ্বালানি ও শিল্প পরিকাঠামোও বারবার হামলার লক্ষ্য হচ্ছে। ইউক্রেনের কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে রাশিয়ার তেল পরিশোধন ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করা। অন্যদিকে, মস্কোও ইউক্রেনের শহর, পরিকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতার উপর ধারাবাহিক আকাশ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
নিজনেকামস্কের হামলায় মৃতের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে। একইসঙ্গে তানেকো শোধনাগারের উৎপাদন ব্যবস্থায় কতটা প্রভাব পড়েছে, তা স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা রয়েছে। আপাতত ১৩ জনের মৃত্যু ও ৭৫ জন আহতের খবরই এই হামলার ভয়াবহতার ছবি তুলে ধরছে। যুদ্ধের ময়দান থেকে বহু দূরে রাশিয়ার অভ্যন্তরে এমন হামলা সংঘাতের পরিধি আরও কতটা বাড়াতে পারে, তা নিয়েই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।



