ইরান যুদ্ধের প্রথম চার মাসে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ৫২টি বিমান ও ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে উঠে এসেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের পরিদর্শক-সাধারণের (Department of Defense Inspector General) রিপোর্টে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের হিসাব নিয়ে তৈরি এই প্রতিবেদনে একইসঙ্গে শতাধিক মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ খরচের তথ্যও সামনে এসেছে।
তবে ৫২টি বিমান-ড্রোনের পুরো সংখ্যাটিকে ইরানের হাতে ‘ধ্বংস’ বলে দেখানো ঠিক হবে না। রিপোর্টে শত্রুপক্ষের হামলা, friendly fire, দুর্ঘটনা, মাটিতে ক্ষয়ক্ষতি এবং উদ্ধার করা সম্ভব না হওয়ায় মার্কিন বাহিনীর নিজেরাই ধ্বংস করে দেওয়া কয়েকটি হেলিকপ্টার—সব ধরনের ক্ষয়ক্ষতি একসঙ্গে হিসাব করা হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় অন্তত ১১ ধরনের বিমান ও ড্রোন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে F-15E যুদ্ধবিমান, A-10 অ্যাটাক এয়ারক্রাফট, KC-135 ট্যাঙ্কার, E-3 আকাশপথের কমান্ড ও নজরদারি বিমান, একাধিক হেলিকপ্টার এবং MQ-9 Reaper ড্রোন। সর্বাধিক সংখ্যার ক্ষতি হয়েছে MQ-9 Reaper-এ—রিপোর্টে সর্বোচ্চ ৩০টি এমন ড্রোনের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব রয়েছে।
রিপোর্টে চারটি F-15E ধ্বংস হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় একটি A-10, সাতটি KC-135, একটি E-3, চারটি AH-6, একটি AH-64 এবং একটি MH-60-সহ আরও কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। পাশাপাশি একটি F-35A শত্রুপক্ষের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে—সেটিকে ধ্বংস হওয়া বিমান হিসেবে দেখানো হয়নি।
এই সংঘাতের প্রভাব শুধু আকাশযানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মার্কিন বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্য-সহ বিভিন্ন ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতরও ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলির মধ্যে রয়েছে।
সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে গোলাবারুদের মজুত নিয়ে। মার্কিন পরিদর্শক-সাধারণের রিপোর্ট বলছে, যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ব্যবহৃত গোলাবারুদের পরিমাণে কৌশলগত মজুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাতেও bottleneck দেখা দিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুনের মধ্যে শুধু ব্যবহৃত গোলাবারুদের পেছনেই প্রায় ২২.৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।
একই সময়ে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury)-র মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৩৩.৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির মূল্যও আলাদাভাবে হিসাব করা হয়েছে। মার্কিন পরিবহণ কমান্ডও এই অভিযানে বিপুল সংখ্যক মিশন পরিচালনা করেছে এবং ৩০ জুন পর্যন্ত তার ব্যয় প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।
মানবিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও কম নয়। ৩০ জুন পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর হিসাবে অন্তত ৪১৭ জন সদস্য আহত হয়েছিলেন। ওই সময় পর্যন্ত ১১ জনকে ‘killed in action’ এবং আরও সাতজনকে non-hostile events-এ নিহত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী মাসগুলিতে সংঘাত চলতে থাকায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর মোট casualty সংখ্যা আরও বেড়েছে।
অর্থাৎ, ইরান যুদ্ধের প্রথম চার মাসের এই সরকারি মার্কিন হিসাব থেকে যে চিত্রটি স্পষ্ট, তা হল—ওয়াশিংটনের ক্ষয়ক্ষতি কেবল কয়েকটি যুদ্ধবিমান হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিমান ও ড্রোন, সামরিক স্থাপনা, গোলাবারুদের মজুত এবং যুদ্ধ পরিচালনার বিপুল আর্থিক ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়েছিল। তবে ৫২টি বিমান ও ড্রোনের সংখ্যাকে শুধুমাত্র ইরানের হাতে ধ্বংস হওয়া যুদ্ধবিমান হিসেবে ব্যাখ্যা করলে রিপোর্টের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে তা মিলবে না।



