ভারতে প্রায় দু’বছর অবস্থানের পর বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা আগেই করেছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গ্রেপ্তার, কারাবাস এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কা থাকলেও ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন তিনি। এবার সেই প্রত্যাবর্তন ঘিরে আওয়ামি লিগের অন্দরে তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
চলতি বছরের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, তিনি এবং আওয়ামি লিগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে পারেন। তাঁর কথায়, গ্রেপ্তার বা এমনকি মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলেও নিজের দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসবেন না।
এর পর অগস্টেও দিল্লি থেকে দেওয়া বার্তায় হাসিনা ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা পুনরায় জানান। ১৯৭১-এর বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে সামনে রেখেই দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন। তবে নির্দিষ্ট ১৪ ডিসেম্বরের তারিখটি এখনও তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যে নিশ্চিত হয়নি।
দলীয় সূত্রের দাবি, ১৪ ডিসেম্বরকে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের দিন ধরে আওয়ামি লিগের অভ্যন্তরে আলোচনা চলছে। দেশে ফেরার প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করতেই শেখ হাসিনা দিল্লিতে দলের একাধিক নেতার সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন বলেও সূত্রের দাবি। প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল-সহ কয়েকজন নেতার নামও এই আলোচনায় উঠে এসেছে।
তবে এই বৈঠক এবং ১৪ ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্য সরকারি ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি আপাতত দলীয় সূত্রের দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
হাসিনার প্রত্যাবর্তনের সময়কে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাত দফায় করার প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়েছে। প্রথম দফার ভোট ১২ নভেম্বর এবং শেষ দফার ভোট ২৭ মে ২০২৭-এ হওয়ার কথা। দ্বিতীয় দফা ১৩ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় দফা ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারণের প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম দফায় ৮০টি উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, প্রায় ৪,৫০০ ইউনিয়ন পরিষদকে ধাপে ধাপে ভোটের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কমিশন জানিয়েছে, ঘোষিত সময়সূচি প্রাথমিক এবং আলোচনার পর তা চূড়ান্ত করা হবে।
এই নির্বাচনী সূচিকে ঘিরেও রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। আওয়ামি লিগের দাবি, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং দলীয় সংগঠন পুনর্গঠনের পথ আটকাতেই বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভোটের এই কৌশল নেওয়া হচ্ছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন কোনও প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ অগস্ট বাংলাদেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি গত দু’বছরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের সঙ্গে সম্পর্কিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
এদিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লিগের রাজনৈতিক কার্যক্রমও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে দেশে ফিরে তাঁর আইনি অবস্থান কী হবে এবং দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও অতীতে ভারতকে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ডিসেম্বরকে সামনে রেখে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ১৪ ডিসেম্বর সত্যিই তিনি দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে তাঁকে ঘিরে আইনি পদক্ষেপ কী হবে এবং আওয়ামি লিগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে—এই তিনটি প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।



