দুর্নীতি ও অনিয়মের একাধিক অভিযোগের তদন্তের মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে ইস্তফা দিলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ (Saima Wazed)। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে বেতনহীন ছুটিতে ছিলেন তিনি। অভিযোগগুলির মধ্যে রয়েছে আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে তথ্য গোপন এবং বাংলাদেশে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অনিয়ম। সায়মা অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পাঁচ বছরের মেয়াদে WHO-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন সায়মা। ২০২৩ সালে নয়াদিল্লিতে WHO-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কমিটির ৭৬তম অধিবেশনে তাঁর মনোনয়ন হয়। পরে WHO-র এক্সিকিউটিভ বোর্ড আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁকে ওই পদে নিয়োগ করে।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পরই তাঁর নিয়োগ ঘিরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC) তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের তদন্ত শুরু করে এবং WHO-র আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে তাঁকে সরানোর উদ্যোগও নেয় বলে Reuters জানিয়েছে। অভিযোগ ছিল, মায়ের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি পদটি পেয়েছিলেন এবং পরে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন।
তদন্তের আওতায় আসে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও। বিশেষ করে চিন সফরের খরচ সংক্রান্ত অনিয়ম এবং তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বাংলাদেশে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের অংশ ছিল। তবে সায়মা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। চিন সফরের খরচের ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য, তাঁর কর্মীদের প্রশাসনিক ভুলের কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও তিনি অনিয়মের অভিযোগ মানেননি।
অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন ২০২৫ সালের জুলাই থেকে তাঁকে বেতনহীন ছুটিতে পাঠানো হয়। WHO-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক দফতরের ওয়েবসাইটেও বর্তমানে তাঁকে ছুটিতে থাকা আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ১৭ আগস্ট ২০২৬ থেকে ড. নিলেশ বুদ্ধা (Nilesh Buddha) ওই দফতরের Officer-in-Charge হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ইস্তফাপত্রে WHO-র নেতৃত্বের উপর আস্থা ও বিশ্বাস হারানোর কথাও জানিয়েছেন সায়মা। Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় বেতনহীন ছুটিতে থাকার ফলে তাঁর আর্থিক পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়েছিল। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, যে দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকে নির্বাচিত করা হয়েছিল, তা তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেছেন; কিন্তু কার্যকর ভাবে কাজ করার সুযোগ না পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন।
WHO-তে যোগ দেওয়ার আগে মানসিক স্বাস্থ্য এবং অটিজম নিয়ে কাজ করেছেন সায়মা। WHO-র তথ্য অনুযায়ী, তিনি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং স্কুল সাইকোলজিতে Specialist degree অর্জন করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে তিনি লাইসেন্সপ্রাপ্ত স্কুল সাইকোলজিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের সময় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশল পরিকল্পনার প্রধান উপদেষ্টা এবং অটিজম ও নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার সংক্রান্ত জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপার্সন ছিলেন তিনি। WHO-তে যোগ দেওয়ার আগে সংস্থাটির ডিরেক্টর জেনারেলের মানসিক স্বাস্থ্য ও অটিজম বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন।
এখন সায়মার পদত্যাগের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের নতুন আঞ্চলিক পরিচালক বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রার্থীদের মনোনয়ন চাওয়া হবে অক্টোবরে এবং আগামী জানুয়ারিতে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ, WHO-র এই গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পদে খুব শীঘ্রই নতুন মুখ দেখা যেতে পারে।



