ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরবেন হাসিনা? প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকা-দিল্লি টানাপোড়েনের মাঝেই বড় বার্তা মুজিব কন্যার

হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা জানালেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা, বিএনপি সরকার ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও মন্তব্য করলেন তিনি।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

ডিসেম্বরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা ফের স্পষ্ট করলেন শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina)। হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জানালেন, ক্ষমতায় ফেরার জন্য নয়, দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতেই তাঁর প্রত্যাবর্তন। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা, বিএনপি সরকারের কার্যকলাপ এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়েও সরব হয়েছেন তিনি। তবে ঠিক কবে দেশে ফিরবেন, সেই দিনক্ষণ এখনও জানাননি হাসিনা।

বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের প্রসঙ্গ অবশ্য নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন তিনি। গত ৫ অগস্ট ভারতে সাংবাদিক বৈঠকেও সেই বার্তা দিয়েছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। এবার সাক্ষাৎকারে ফের জানালেন, পরিস্থিতি অনুকূল না হলেও বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছেন না।

হাসিনার এই বক্তব্য এমন সময়ে সামনে এল, যখন আসন্ন ব্রিক্‌স সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে (Tarique Rahman) ভারতে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। তারেক দিল্লিতে এলে হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকা কোনও শর্ত দিয়েছে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা রয়েছে। যদিও এই সমীকরণের সঙ্গে তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কোনও যোগ রয়েছে বলে মানতে নারাজ হাসিনা।

সাক্ষাৎকারে তারেক রহমানের প্রসঙ্গ তুলে ব্রিটেনে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথাও উল্লেখ করেছেন হাসিনা। তাঁর বক্তব্য, বিদেশে থাকা অবস্থায় তারেক রাজনীতি করেছেন, দলীয় দায়িত্ব সামলেছেন এবং ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। অথচ সেই সময় তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে কোনও অভিযোগ করেননি। তাই নিজের দেশে ফেরাকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য কীভাবে শর্ত করা যায়, সেই প্রশ্ন তুলেছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।

তাহলে কেন ফিরতে চাইছেন তিনি? হাসিনার ব্যাখ্যা, বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেই তাঁর দেশে ফেরার ইচ্ছা। তাঁর মতে, উন্নয়ন থমকে গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যায়, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং চরমপন্থী শক্তির উত্থান গোটা অঞ্চলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

দেশে ফিরলে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা নিয়েও যথেষ্ট দৃঢ় হাসিনা। নিজের জীবনে একাধিক হামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কথা তুলে ধরে তিনি জানিয়েছেন, হুমকি তাঁকে নিজের দায়িত্ব থেকে সরাতে পারবে না। ১৯৭৫ সালে পরিবারের সদস্যদের হারানো থেকে শুরু করে ২০০৪ সালের ২১ অগস্টের গ্রেনেড হামলা—অতীতের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন।

ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্য তাঁর নেই বলেও দাবি করেছেন হাসিনা। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোই দেশে ফেরার মূল উদ্দেশ্য। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার কথা জানালেও নির্দিষ্ট তারিখ এখনও প্রকাশ করেননি। সময় এলে দিনক্ষণ জানানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা নিয়েও সরব হয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর প্রশ্ন, আওয়ামী লীগ কোনও অপরাধ করে থাকলে তার বিচার বা রাজনৈতিক মূল্যায়ন জনগণই করবে। নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ সেই সিদ্ধান্ত জানাতে পারে। একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার অধিকার বর্তমান ক্ষমতাসীনদের রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যক মামলা হওয়ার দাবিও করেছেন হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, দলের ছোট-বড় বহু নেতা মামলা ও হয়রানির মুখে পড়েছেন। একইসঙ্গে ২০২৪ সালের ১৫ জুলাইয়ের পর বাংলাদেশে অগ্নিসংযোগ, হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলির জন্যও মামলা হওয়া উচিত ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, অভিযুক্তদের একাংশ দায়মুক্তি পেয়েছেন এবং দেশে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলি সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও আত্মবিশ্বাসী হাসিনা। তাঁর দাবি, কোনও নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক দলের জনসমর্থন মুছে দিতে পারবে না। দল থাকবে এবং নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে হাসিনার ভারত থেকে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের আপত্তি আগেও প্রকাশ্যে এসেছে। ঢাকার তরফে দাবি করা হয়েছিল, ভারতের মাটি থেকে ওই ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নয়াদিল্লি অবশ্য স্পষ্ট করেছে, ওই সাংবাদিক বৈঠকের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনও সম্পর্ক ছিল না এবং সেখানে দেওয়া বক্তব্যকে ভারত সরকার সমর্থন করে না।

ফলে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা এখন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন করে তাৎপর্য তৈরি করেছে। তিনি ঠিক কবে ঢাকার মাটিতে ফিরবেন, সেই সিদ্ধান্ত এখনও প্রকাশ্যে না এলেও তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার—প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা তিনি আপাতত স্থগিত করছেন না।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন