চিনের কাছ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার কেনার পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকার পরিকল্পনায় রয়েছে চিনা J-10CE মাল্টিরোল ফাইটার জেট, অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং ড্রোন ব্যবস্থা। বাংলাদেশের বিমানবাহিনীকে আধুনিক করে তোলার এই উদ্যোগকে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর বৃহত্তর আধুনিকীকরণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান জানিয়েছেন, J-10CE যুদ্ধবিমান এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে ইতিমধ্যেই খসড়া চুক্তি তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে চলতি অর্থবর্ষেই এই প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার প্রক্রিয়া এগোতে পারে। না হলে তা পরবর্তী বাজেটে নেওয়া হবে।
বিমানের সংখ্যাকে ঘিরে অবশ্য এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট ছবি নেই। বিভিন্ন বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে ২৪টি J-10CE কেনার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। আবার বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০টি J-10CE-র জন্য প্রায় ২.৩০২ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৮,৩১৪ কোটি টাকার মোট ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বিমান সংখ্যা ও মোট খরচ—দুটিই পরিবর্তিত হতে পারে।
শুধু যুদ্ধবিমান কেনার খরচই নয়, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, লজিস্টিক সাপোর্ট, অস্ত্র, পরিকাঠামো এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যোগ হলে প্রকল্পের ব্যয় অনেকটাই বেড়ে যায়। ২০টি বিমানের ক্ষেত্রে প্রকাশিত হিসাবেই এই অতিরিক্ত খরচের বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সামরিক আধুনিকীকরণের লক্ষ্যও যথেষ্ট বড়। পুরনো প্রযুক্তির যুদ্ধবিমানগুলির জায়গায় আধুনিক মাল্টিরোল ফাইটার, অ্যাটাক ও VIP হেলিকপ্টার এবং UAV ব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ শুধু একটি নতুন যুদ্ধবিমান কেনা নয়, বিমানবাহিনীর সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ।
J-10CE নিয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের পিছনে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতও একটি কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। ওই সংঘাতে পাকিস্তানের J-10 ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। পাকিস্তান দাবি করেছিল, এই বিমান ভারতীয় যুদ্ধবিমানকে গুলি করে নামিয়েছে। তবে সেই দাবির সবটাই স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি—এই বিষয়টিও উল্লেখ করেছে রয়টার্স।
এর পাশাপাশি বদলাচ্ছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণও। সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি গড়ে ওঠা মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি (Makkah Defence Pact)-এ বাংলাদেশকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ঢাকার পক্ষ থেকেও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করার কথা জানানো হয়েছে।
তবে চিনা যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্তকে সরাসরি ওই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের সঙ্গে যুক্ত করার মতো সরকারি ঘোষণা এখনও নেই। বরং একাধিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পদক্ষেপকে পাশাপাশি রেখে বিশ্লেষকেরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য—দুই দিকই এখন ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ফলে J-10CE কেনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু এই বিপুল ব্যয়ের প্রতিরক্ষা চুক্তি শেষ পর্যন্ত কতগুলি বিমান, কী ধরনের অস্ত্র ও সহায়ক ব্যবস্থা নিয়ে চূড়ান্ত হবে, এবং বাংলাদেশের বৃহত্তর বিদেশনীতি ও নিরাপত্তা কৌশলে তার প্রভাব কতটা পড়বে—সেই উত্তর মিলবে চূড়ান্ত চুক্তি ও পরবর্তী পদক্ষেপেই।



