বাংলার বিরুদ্ধে আর্থিক বঞ্চনার অভিযোগ ফের উঠল। এবার বিদ্যুৎ তহবিলের প্রাপ্য কমছে—এই দাবি তুলে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হল তৃণমূল। কেন্দ্র বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ কমিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করে রাজ্যের শাসকদল। শীতকালীন অধিবেশনে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী শ্রীপদ নায়কের দেওয়া তথ্যেও সেই ইঙ্গিত মিলছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদে জানতে চান—RDS S (Revamped Distribution Sector Scheme) প্রকল্পে বাংলার জন্য বরাদ্দ কত, আর বাস্তবে কত অর্থ রাজ্যের হাতে এসেছে। কেন্দ্রের দেওয়া খতিয়ান অনুযায়ী, এই খাতে বাংলার মোট বরাদ্দ ৬,৪২৩ কোটি টাকা, কিন্তু গত কয়েক বছরে রাজ্যের হাতে এসেছে এর এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।


২০২৩–২৪ অর্থবর্ষে কেন্দ্র বাংলাকে দিয়েছে ২২১ কোটি টাকা।
২০২৪–২৫ সালে পাঠানো হয়েছে ৬০১ কোটি।
আর চলতি অর্থবর্ষ ২০২৫–২৬–এ নভেম্বর পর্যন্ত রাজ্যের হাতে পৌঁছেছে মাত্র ৪৯ কোটি টাকা।
বাংলার বিদ্যুৎ তহবিলের প্রাপ্য কমিয়েছে কেন্দ্র? অভিষেকের প্রশ্নে প্রকাশ পেল বরাদ্দের খতিয়ান
তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, এটি কেন্দ্রের আরেকটি ‘বৈষম্যমূলক নীতি’। যেমন ১০০ দিনের কাজ এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় প্রকল্পে অর্থ আটকে রাখা হয়েছে, তেমনি এবার বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে RDS S তহবিলেও বঞ্চিত হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। তৃণমূলের ভাষায়—
“বিজেপি–শাসিত রাজ্যগুলিকে ভরিয়ে দিচ্ছে কেন্দ্র, কিন্তু বাংলার প্রাপ্যের টাকা পাঠানো হচ্ছে না।”

প্রকল্পটি চালু হয়েছিল ২০২১ সালে। লক্ষ্য ছিল—বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সমতা বজায় রাখা, আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে বিদ্যুৎ পরিষেবাকে শক্তিশালী করা এবং ডিসকমগুলির ক্ষতি কমানো। RDS S–এর মাধ্যমে রাজ্যগুলি যাতে স্বল্প ব্যয়ে গ্রাহকদের মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ পরিষেবা দিতে পারে, সেই লক্ষ্যেই কেন্দ্র বড় তহবিল বরাদ্দ করে। বাংলাতেও সেই প্রকল্প কার্যকর। কিন্তু শাসকদলের অভিযোগ—প্রাপ্য টাকা পাঠানোই হচ্ছে না।


তৃণমূলের অভিযোগকে আরও জোরালো করছে কেন্দ্রীয় তথ্য। কেন্দ্রের দেওয়া খতিয়ান অনুযায়ী, বাংলার তুলনায় বিজেপি–শাসিত রাজ্যগুলি RDS S থেকে পাচ্ছে অনেক বেশি টাকার বরাদ্দ। উদাহরণ হিসেবে—
ছত্তীসগড় পেয়েছে
• ২০২৩–২৪–এ ১৭৮ কোটি,
• ২০২৪–২৫–এ ৩০৪ কোটি,
• ২০২৫–২৬–এ ৩৮২ কোটি।
সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে মধ্যপ্রদেশ—
চলতি বছর তাদের প্রাপ্য ১,২৩৫ কোটি টাকা, যা বাংলার তুলনায় বহু গুণ বেশি।
এই তথ্য সামনে আসতেই শাসকদল তৃণমূল ‘বিমাতৃসুলভ আচরণ’-এর অভিযোগ তুলেছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়,
“সম্প্রতি কয়েক বছর ধরেই কেন্দ্র ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলার বকেয়া আটকে রেখেছে। এবার বিদ্যুৎ খাতেও একই কৌশল। এটি শুধু আর্থিক বৈষম্য নয়, এটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে আঘাত।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ১০০ দিনের কাজের বকেয়া ও কেন্দ্রীয় প্রকল্পে অর্থ–বঞ্চনার অভিযোগকে সামনে রেখে তৃণমূল সরকারকে চাপ বাড়াতে চাইছে। অন্যদিকে, কেন্দ্র বারবার জানিয়েছে—রাজ্যগুলি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় তহবিল আটকে থাকে। তবে বাংলার দাবি—সব নথি পাঠিয়েও টাকা ছাড়ছে না কেন্দ্র।
আগামী কয়েক দিনে এই ইস্যু আরও রাজনৈতিক রূপ নেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। শাসকদলের বক্তব্য—বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া টাকা বন্ধ হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে—রাজ্যেরই প্রশাসনিক ব্যর্থতা দায়ী।
কিন্তু কেন্দ্রীয় খতিয়ান দেখাচ্ছে, বাংলার জন্য বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত অর্থ ছাড় কমে যাচ্ছে প্রতি বছর। ফলে RDS S প্রকল্পে বাংলার বিদ্যুৎ উন্নয়ন কতটা বাধাগ্রস্ত হবে, তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।







