সমাজমাধ্যমে সাধারণ বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু। তার পর ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত কথোপকথন, ফোন ও ভিডিয়ো কল। তদন্তকারীদের অভিযোগ, এই পথেই ভারতীয় নৌসেনার কর্মীদের কাছে পৌঁছেছিল পাকিস্তান-যোগ থাকা গোয়েন্দা চক্র। অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমকে কেন্দ্র করে সামনে আসা এই তদন্তে একাধিক নৌসেনাকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গোটা ঘটনার তদন্ত চলছে ‘অপারেশন ফায়ারওয়াল-২০২৬’ (Operation Firewall-2026)-এর আওতায়।
তদন্তকারীদের দাবি, ফেসবুক (Facebook) এবং ইনস্টাগ্রাম (Instagram)-এ ভুয়ো পরিচয়ে যোগাযোগ তৈরি করাই ছিল এই চক্রের অন্যতম কৌশল। মহিলাদের পরিচয় ব্যবহার করে প্রথমে বিশ্বাস অর্জন করা হত। পরে কথোপকথন সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হত হোয়াট্সঅ্যাপে (WhatsApp)। সেখানেই ধীরে ধীরে চাওয়া হত নৌবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত তথ্য।
বর্তমান তদন্তে মোট ১৮ জনকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে বলে বিভিন্ন তদন্তকারী সূত্রের খবর। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন ভারতীয় নৌসেনার সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সেল। এই ১৩ জনকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি; তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে নেটওয়ার্কটির বিস্তার বোঝার চেষ্টা চলছে। দু’জনকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের নজরে থাকা নৌসেনাকর্মীদের মধ্যে রয়েছেন প্রদীপ মুখার্জি। তিনি বিশাখাপত্তনমের ইস্টার্ন নেভাল কমান্ডে (Eastern Naval Command) কর্মরত ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। প্রশিক্ষণের জন্য কোয়েম্বাটোরে থাকার সময় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের অভিযোগ, পাকিস্তান-যোগ থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা তথ্য আদানপ্রদানেরও সন্দেহ রয়েছে।
এই মামলায় দ্বিতীয় যে ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তিনি অন্নম সাই বরপ্রসাদ। তিনি বিশাখাপত্তনমে নৌসেনার আধিকারিকদের সঙ্গে যুক্ত এক চুক্তিভিত্তিক গাড়িচালক ছিলেন। পুলিশের অভিযোগ, প্রতিরক্ষা ও নৌবাহিনী সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য পাকিস্তান-যোগ থাকা এক ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি এবং এর বিনিময়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—এই যোগাযোগ কী ভাবে তৈরি হয়েছিল?
অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের তদন্ত অনুযায়ী, ‘জোশিতা পাল’ এবং ‘অন্বি মেহতা’ নামে দু’টি ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছিল। এক জন নিজেকে মুম্বইয়ের একটি জাহাজ নির্মাণ সংস্থার কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন। অন্য জন নিজেকে দিল্লির মনোবিদ বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, দু’টি পরিচয়ের পিছনেই পাকিস্তানি গোয়েন্দা-যোগ থাকা ব্যক্তিরা ছিলেন।
প্রথম ধাপ ছিল বিশ্বাস তৈরি করা। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে পরিচয়ের পর কথাবার্তা চলত। সম্পর্ক কিছুটা ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর যোগাযোগের মাধ্যম বদলে হোয়াট্সঅ্যাপ করা হত। এরপর মেসেজের পাশাপাশি ভয়েস এবং ভিডিয়ো কল শুরু হত। তদন্তকারীদের অভিযোগ, ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাকে ব্যবহার করেই নৌসেনাকর্মীদের কাছ থেকে ধীরে ধীরে তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।
কী ধরনের তথ্য চাওয়া হয়েছিল, সেটিই এখন তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, নৌবাহিনীর জাহাজ ও সাবমেরিনের সংখ্যা এবং গতিবিধি, ছবি-ভিডিয়ো, প্রতিরক্ষা পরিকাঠামো এবং কমান্ডিং অফিসারদের সম্পর্কিত তথ্য চাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। এমনকি ভিডিয়ো কলের সময় সংবেদনশীল এলাকা বা নৌঘাঁটির কিছু অংশ ক্যামেরায় দেখানোর জন্যও চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
চক্রটির কৌশল শুধু তথ্য সংগ্রহে থেমে ছিল না বলেও তদন্তকারীদের দাবি। ভারতীয় মোবাইল নম্বর এবং হোয়াট্সঅ্যাপের OTP ব্যবহার করে আরও অ্যাকাউন্ট তৈরি করার একটি ব্যবস্থা ছিল বলে অভিযোগ। ভারতীয়দের কাছ থেকে OTP নেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক প্রলোভন দেওয়া হত বলেও তদন্তে দাবি করা হয়েছে। সেই OTP ব্যবহার করে পাকিস্তান থেকে ভারতীয় নম্বরে হোয়াট্সঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
এর ফলে একটি অ্যাকাউন্ট হাতের মধ্যে এলে সেটিকে আবার নতুন টার্গেটের সঙ্গে যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করা যেত বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। অর্থাৎ একজনকে ফাঁদে ফেলে পাওয়া ডিজিটাল অ্যাক্সেস থেকেই আরও কয়েক জনের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে। এই কারণেই তদন্তকারীরা শুধু ব্যক্তিগত কথোপকথন নয়, মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, হোয়াট্সঅ্যাপ যোগাযোগ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্যও খতিয়ে দেখছেন।
অর্থের লেনদেন নিয়েও তদন্ত চলছে। পুলিশের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে টাকা পৌঁছনোর ব্যবস্থা থাকতে পারে। এই আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে পাকিস্তান-যোগ থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্ক কতটা গভীর, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
গোটা তদন্তে ১ অক্টোবর দেশজুড়ে একযোগে অভিযান চালানো হয়। অন্ধ্রপ্রদেশের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সেলের ১২টি দল ১০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে তল্লাশি চালায়। অন্ধ্রপ্রদেশের পাশাপাশি কেরল, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, গুজরাত, গোয়া, দিল্লি, তামিলনাড়ু, ছত্তীসগঢ় এবং বিহারেও তদন্তের সূত্র পৌঁছেছে। নৌবাহিনী, স্থানীয় পুলিশ এবং বিভিন্ন রাজ্যের অ্যান্টি-টেরর স্কোয়াডও তদন্তে সহযোগিতা করছে।
এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত দু’জনের গ্রেফতার হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে সংবেদনশীল তথ্য পাকিস্তান-যোগ থাকা ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দু’জনকেই বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে এবং তদন্ত এগিয়ে চলেছে। বাকি সন্দেহভাজনদের ক্ষেত্রে প্রমাণ সংগ্রহের পরেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করা হবে বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা অবশ্য বিশাখাপত্তনমে প্রথম নয়। ২০১৯ সালেও ‘অপারেশন ডলফিন’স নোজ’ (Operation Dolphin’s Nose)-এর মাধ্যমে ইস্টার্ন নেভাল কমান্ডকে লক্ষ্য করে একটি পাকিস্তান-যোগ থাকা গুপ্তচরচক্রের হদিস মিলেছিল। সেই মামলায় নৌসেনার কয়েক জন কর্মী-সহ বহু জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সেই ক্ষেত্রেও অনলাইন সম্পর্ক, মহিলা পরিচয় এবং তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ সামনে এসেছিল।
ফলে বর্তমান তদন্তে শুধু কয়েক জন কর্মী কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনায় জড়িয়েছেন কি না, তা নয়—তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগকারী ব্যক্তিরা কী ভাবে নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল এবং আরও কত জনকে একই কৌশলে নিশানা করা হয়েছিল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তদন্তকারীরা সেই উত্তর খুঁজছেন ডিজিটাল যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেন এবং উদ্ধার হওয়া ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সূত্র ধরে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা, প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সুরক্ষায় শুধু সীমান্ত বা সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তাই যথেষ্ট নয়। ব্যক্তিগত সমাজমাধ্যমের পরিচয়, হোয়াট্সঅ্যাপ যোগাযোগ, OTP এবং অনলাইন সম্পর্কও এখন গোয়েন্দা চক্রের সম্ভাব্য প্রবেশপথ হয়ে উঠতে পারে। বিশাখাপত্তনমের এই তদন্ত সেই ডিজিটাল ঝুঁকিটিকেই ফের সামনে আনল।



