নানা পটেকরকে শুধু ‘দাপুটে অভিনেতা’ বললে তাঁর জীবনকাহিনির অনেকটাই বাদ পড়ে যায়। অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনে এসেছে গভীর পুত্রশোক, দাম্পত্যের টানাপড়েন, সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা, ‘মি টু’ বিতর্ক। আবার সেই তিনিই ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় সেনাদের পাশে দাঁড়াতে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে একাধিক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবন, মৃত্যু এবং শেষকৃত্য নিয়েও অকপটে কথা বলেছিলেন।
নানা পটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পটেকর। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম। থিয়েটারের হাত ধরে অভিনয়ে আসা, পরে ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘ওয়েলকাম’, ‘নটসম্রাট’-এর মতো ছবিতে একের পর এক ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেন। তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ২০১৩ সালে পদ্মশ্রী তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের অন্যতম স্বীকৃতি।
কিন্তু ক্যামেরার সামনে যতটা দৃঢ় ছিলেন, ব্যক্তিজীবনের কিছু অধ্যায় ততটাই বেদনাদায়ক। স্ত্রী নীলকান্তি পটেকরের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় ১৯৭৮ সালে। তাঁদের দুই সন্তান ছিল। বড় ছেলে দুর্বাসা মাত্র আড়াই বছর বয়সে অসুস্থতায় মারা যায়। বহু বছর পরে এক সাক্ষাৎকারে সেই সন্তান হারানোর কথা বলতে গিয়ে নানা নিজের তৎকালীন মানসিকতার কথাও স্বীকার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সন্তানের অসুস্থতার চেয়েও তখন তিনি ভাবতেন, অন্য মানুষ তাঁর ছেলেকে নিয়ে কী বলবে। সেই উপলব্ধিই পরবর্তীকালে তাঁর কাছে গভীর অনুশোচনার জায়গা হয়ে ওঠে।
ছোট ছেলে মালহার পটেকরই পরবর্তীকালে বাবার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। নীলকান্তির সঙ্গে নানা দীর্ঘদিন আলাদা থাকলেও তাঁদের আইনগত বিচ্ছেদ হয়নি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের দাম্পত্যের দূরত্ব নিয়ে নানা নিজেও অতীতে কথা বলেছেন।
নানার ব্যক্তিজীবন নিয়ে আলোচনায় আর একটি অধ্যায় বার বার সামনে এসেছে—অভিনেত্রী মণীষা কৈরালার সঙ্গে তাঁর কথিত সম্পর্ক। ‘খামোশি’, ‘অগ্নিসাক্ষী’ এবং ‘যুগপুরুষ’-এর মতো ছবিতে তাঁদের একসঙ্গে কাজ এবং ঘনিষ্ঠতার কারণে সেই সময় বলিউডে নানা ধরনের জল্পনা তৈরি হয়েছিল। তবে এই সম্পর্ককে নিশ্চিত প্রেম বা ‘পরকীয়া’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ‘অগ্নিসাক্ষী’-র চিত্রনাট্যকার রণবীর পুষ্পও পরে তাঁদের মধ্যে গভীর বোঝাপড়ার কথা বললেও সেটিকে প্রেমের সম্পর্ক হিসেবে দেখেননি। তাই এই অধ্যায়টি মূলত দীর্ঘদিনের বলিউড জল্পনা হিসেবেই উল্লেখ করা নিরাপদ।
২০১৮ সালের ‘মি টু’ আন্দোলনের সময় নানার জীবনে বড় বিতর্ক তৈরি হয়। অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত ২০০৮ সালের ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ ছবির শুটিং ঘিরে নানার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন। নানার বিরুদ্ধে এফআইআর-ও হয়েছিল। অভিনেতা অভিযোগ অস্বীকার করেন। পরবর্তী তদন্তে পুলিশ নানার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ পায়নি বলে ক্লোজার রিপোর্ট জমা দেয়। ২০২৫ সালে মুম্বইয়ের একটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতও তনুশ্রীর ক্লোজার রিপোর্টের বিরোধিতা করে করা আবেদন খারিজ করে দেয়। অর্থাৎ অভিযোগটি ছিল গুরুতর, কিন্তু তা আদালতে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তবে নানার জীবনের সবচেয়ে অস্বাভাবিক অধ্যায়গুলির একটি ছিল কার্গিল যুদ্ধ। ১৯৯৯ সালে অভিনয় থেকে বিরতি নিয়ে তিনি ভারতীয় সেনার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। ‘প্রহার’ ছবির প্রস্তুতির সময় মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল। পরে তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজের অনুমতি নিয়ে তিনি কার্গিলে যান বলে নানা নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন।
নানা জানিয়েছিলেন, নিয়ন্ত্রণরেখার কাছাকাছি এলাকায় তিনি দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ছিলেন। সেনাদের সঙ্গে থেকে বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করার পাশাপাশি বেস হাসপাতালেও কাজ করেছিলেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, তিনি সেনাবাহিনীর কুইক রিঅ্যাকশন টিমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সেই কঠিন পরিবেশে তাঁর ওজন প্রায় ২০ কেজি কমে গিয়েছিল—শ্রীনগরে যাওয়ার সময় প্রায় ৭৬ কেজি থেকে ফিরে তা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৫৬ কেজিতে।
অভিনয়ের বাইরে সমাজসেবাতেও সক্রিয় ছিলেন নানা। কৃষক ও খরাপ্রবণ এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে তিনি ‘নাম ফাউন্ডেশন’ তৈরি করেন। মহারাষ্ট্রের কৃষক আত্মহত্যা, জলসংকট এবং গ্রামীণ সমস্যার ক্ষেত্রে সংগঠনটি কাজ করেছে। ফলে নানার পরিচয় শুধু অভিনেতা হিসেবে আটকে থাকেনি।
মৃত্যু নিয়েও নানার ভাবনা ছিল অন্যরকম। এক পুরনো সাক্ষাৎকারে নিজের শেষকৃত্য নিয়ে তিনি রীতিমতো প্রস্তুতির কথা বলেছিলেন। জানিয়েছিলেন, তাঁর জন্য শুকনো কাঠ আলাদা করে রাখা আছে—প্রায় ১২ মণ। এমনকি কেন শুকনো কাঠ ব্যবহার করতে হবে, তার যুক্তিও দিয়েছিলেন নিজের স্বভাবসিদ্ধ রসিকতায়। তাঁর কথায়, ভেজা কাঠে বেশি ধোঁয়া হবে, আর শেষকৃত্যে উপস্থিত মানুষের চোখে জল এলে সেটিকে অন্য ভাবে দেখা হতে পারে।
আর মৃত্যুর কয়েক দিন আগে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও নতুন করে সামনে আসে। তিনি বলেছিলেন, শিল্পীদের জীবন অনেকটাই অন্যের জন্য—এক চরিত্র শেষ হলে আরেক চরিত্রের জীবন শুরু হয়। নিজের জন্য বাঁচার সময় যেন আর হয়ে ওঠে না। মৃত্যুর প্রসঙ্গেও তাঁর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত সরল—সময় হলে চলে যেতে হবে, তাই মৃত্যু নিয়ে অতিরিক্ত ভয় বা নাটকীয়তার কোনও প্রয়োজন নেই।
৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার ডোনা পাউলার বাড়িতে মৃত্যু হল সেই নানা পটেকরের। বুকে ব্যথা অনুভব করার পর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট সিপিআর দেওয়ার পরও তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। ভোর ৫টা ২০ মিনিট নাগাদ তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুর কারণ ও পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে মেডিকো-লিগ্যাল প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ময়নাতদন্তের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
পর্দায় তিনি কখনও ক্রুদ্ধ, কখনও ভয়ঙ্কর, কখনও অসহায়, আবার কখনও নিখাদ হাসির চরিত্র হয়ে উঠেছেন। কিন্তু পর্দার বাইরে তাঁর জীবনও ছিল ততটাই বহুস্তরীয়—পুত্রশোক, দাম্পত্যের দূরত্ব, সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা, বিতর্ক, সেনাবাহিনীর সঙ্গে কার্গিলের অভিজ্ঞতা, সমাজসেবা এবং মৃত্যুকে নিয়েও নির্ভীক রসিকতা। তাই নানা পটেকরের জীবন শুধু একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়; বরং আলো-আঁধারিতে ভরা এক দীর্ঘ, অস্বস্তিকর এবং একই সঙ্গে অসাধারণ যাত্রা।



