নানা পটেকরের (Nana Patekar) আকস্মিক মৃত্যু ঘিরে চিকিৎসা সংক্রান্ত আইনি মামলা বা মেডিকো-লিগ্যাল কেস (Medico-Legal Case) দায়ের হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ার ডোনা পাউলায় নিজের বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন ৭৫ বছরের অভিনেতা। পরে তাঁকে মণিপাল হাসপাতালে (Manipal Hospital) নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচাতে পারেননি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্ত করা হবে।
হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শেখর সালকার জানিয়েছেন, নানা পটেকরকে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে সিপিআর (CPR) দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতেও সাড়া মেলেনি। ভোর ৫টা ২০ মিনিট নাগাদ তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। হাসপাতালের তরফে জানানো হয়েছে, মৃত্যুর পরিস্থিতি এবং সঠিক কারণ নির্ধারণের জন্যই মেডিকো-লিগ্যাল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক ভাবে জানা যাচ্ছে, ভোরে বুকে ব্যথা অনুভব করেছিলেন নানা। তাঁর ছেলে মলহার পটেকরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অসুস্থ বোধ করার পর চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। চিকিৎসকদের একটি দল তাঁর বাড়িতেও পৌঁছয়। কিন্তু ততক্ষণে অভিনেতা অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলেন। বাড়িতেই তাঁকে সিপিআর দেওয়া হয় এবং পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালে পৌঁছনোর পরও চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাঁকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। তবে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। চিকিৎসক সালকার জানিয়েছেন, ওই সময় নানা পটেকর ‘অ্যাসিস্টোলি’ অবস্থায় ছিলেন—অর্থাৎ হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের কোনও লক্ষণ ছিল না।
মেডিকো-লিগ্যাল কেস দায়ের হওয়ার অর্থ এই নয় যে মৃত্যুর পিছনে কোনও অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। এই ধরনের ক্ষেত্রে মৃত্যুর পরিস্থিতি ও কারণ নথিভুক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ও চিকিৎসাগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। নানা পটেকর মণিপাল হাসপাতালের নিয়মিত রোগী ছিলেন না বলেই এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলে চিকিৎসকের বক্তব্য থেকে জানা যাচ্ছে।
ময়নাতদন্তের জন্য তাঁর দেহ গোয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে (Goa Medical College and Hospital) পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টেই মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে। ফলে আপাতত হৃদ্রোগ বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টকে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও চূড়ান্ত চিকিৎসাগত সিদ্ধান্তের জন্য ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা থাকবে।
নানা পটেকরের মৃত্যুতে একই সঙ্গে শোক নেমে এসেছে বলিউড এবং মারাঠি চলচ্চিত্র জগতে। রীতেশ দেশমুখ, মুকেশ ছাবরা, নীল নীতিন মুকেশ-সহ একাধিক অভিনেতা ও চলচ্চিত্রকর্মী সমাজমাধ্যমে প্রয়াত অভিনেতাকে স্মরণ করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে নানার অভিনয়ের স্বাতন্ত্র্য এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের স্মৃতি।
প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে নানা পটেকর তৈরি করেছিলেন নিজস্ব একটি অভিনয়ভাষা। ১৯৭৮ সালের ‘গমন’ দিয়ে বড় পর্দায় যাত্রা শুরু। পরে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি’, ‘অব তক ছাপ্পন’, ‘ওয়েলকাম’-সহ একাধিক ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
গম্ভীর চরিত্রের পাশাপাশি কমেডিতেও নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন নানা। ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেট্টি চরিত্র তাঁর অভিনয়জীবনের একেবারে অন্য দিক দর্শকদের সামনে নিয়ে আসে। হিন্দির পাশাপাশি মারাঠি সিনেমাতেও তাঁর কাজ সমান ভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
অভিনয়ের জন্য তিন বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন নানা পটেকর। ২০১৩ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে ভারত সরকার। অভিনয়ের পাশাপাশি ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ ছবির পরিচালনাও করেছিলেন তিনি। থিয়েটারের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল।
মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগেও প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ৪ অক্টোবর গোয়ার ডোনা পাউলায় একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন নানা। সেই উপস্থিতিই এখন তাঁর শেষ প্রকাশ্য অনুষ্ঠানগুলির একটি হিসেবে সামনে এসেছে।
তবে এই মুহূর্তে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিকিৎসাগত ও আইনি প্রক্রিয়া। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। আপাতত হাসপাতাল ও প্রশাসনের তরফে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতেই তদন্ত ও পরবর্তী প্রক্রিয়া এগোচ্ছে।
নানা পটেকরের আকস্মিক প্রয়াণে ভারতীয় সিনেমা হারাল এক স্বতন্ত্র অভিনেতাকে। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতি যখন সহকর্মী ও দর্শকেরা ফিরে দেখছেন, তখন তাঁর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের দিকেই নজর থাকবে।



