‘ক্যাশলেস’ অর্থনীতি থেকে কি ফের নগদের দিকে ফিরবে ভারত? ১৫ অক্টোবর থেকে ২,০০০ টাকার বেশি নির্দিষ্ট UPI merchant payment-এ ০.৪ শতাংশ MDR চালু হতে চলায় সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে। জাতীয় পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া (National Payments Corporation of India)-র নতুন কাঠামোয় সাধারণ গ্রাহক সরাসরি এই চার্জ দেবেন না; মূল খরচ বহন করবেন নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যবসায়ীরা।
একই সময়ে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা দেশগুলির উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর ক্ষমতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেওয়ার আইনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ১০০ শতাংশ শুল্ক স্বয়ংক্রিয় ভাবে ভারতের উপর বসেনি—আইনটি প্রেসিডেন্টকে তা আরোপের ক্ষমতা দিয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর আইনটি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে ভারতীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালের বক্তব্য উদ্ধৃত করে রিপোর্ট হয়েছে।
এই দুই সিদ্ধান্তকে একই অর্থনৈতিক ছবির অংশ হিসেবে দেখছেন বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, UPI-তে MDR চালুর পিছনে বিদেশি বাণিজ্যিক চাপের ভূমিকা রয়েছে এবং এর ফলে ভারতের নিজস্ব ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার উপর বাড়তি খরচ তৈরি হবে। কেন্দ্র অবশ্য এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। অর্থ মন্ত্রকের বক্তব্য, সিদ্ধান্তটি বিদেশি চাপের কারণে নয় এবং সাধারণ গ্রাহকের UPI ব্যবহারে কোনও অতিরিক্ত চার্জ বসছে না।
নতুন নিয়মে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত merchant UPI payment-এ MDR থাকছে না। ২,০০০ টাকার বেশি নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক লেনদেনে ০.৪ শতাংশ হারে MDR ধার্য হবে। ৭৫,০০০ টাকা বা তার বেশি লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ MDR হবে ৩০০ টাকা। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির (P2P) UPI লেনদেনও আগের মতোই বিনামূল্যে থাকবে।
ছোট ব্যবসায়ীদের জন্যও ছাড় রাখা হয়েছে। UPI QR-এর মাধ্যমে মাসে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত গ্রহণকারী নির্দিষ্ট ছোট ব্যবসায়ীরা এই MDR কাঠামোর বাইরে থাকবেন। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে প্রায় ৯৬ শতাংশ merchant transaction নতুন MDR-এর প্রভাবমুক্ত থাকবে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবার জন্য আবার ০.৪ শতাংশের বদলে নির্দিষ্ট ৫ টাকা MDR রাখা হয়েছে। রেল টিকিট, জ্বালানি, টেলিকম, বিমা এবং বিদ্যুৎ-জল-গ্যাসের মতো utility payment-এর ক্ষেত্রে ২,০০০ টাকার বেশি লেনদেনে এই flat rate প্রযোজ্য হবে।
তবে ব্যবসায়ীদের খরচের হিসাব এখানেই শেষ নয়। MDR-এর উপর ১৮ শতাংশ GST প্রযোজ্য হবে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ ১০,০০০ টাকার একটি সাধারণ যোগ্য UPI merchant transaction-এ ৪০ টাকা MDR হলে তার উপর আরও GST যুক্ত হবে। GST-নিবন্ধিত যোগ্য ব্যবসায়ীরা অবশ্য নিয়ম মেনে Input Tax Credit পাওয়ার সুযোগ রাখতে পারেন।
সরকারের অবস্থান, এই অর্থ কোনও ‘UPI tax’ হিসেবে সরকারি কোষাগারে যাবে না। MDR থেকে পাওয়া অর্থ পেমেন্ট ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশগ্রহণকারী—ব্যাঙ্ক, পেমেন্ট অ্যাপ ও অন্যান্য পরিষেবা প্রদানকারীদের মধ্যে বণ্টিত হবে। সরকারের দাবি, এর উদ্দেশ্য UPI পরিকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং পরিষেবার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির একাংশ আশঙ্কা করছে, নতুন খরচ শেষ পর্যন্ত কোনও না কোনও ভাবে ক্রেতার উপর পড়তে পারে। কেউ কেউ নগদে পেমেন্ট উৎসাহিত করতে পারেন বলেও আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা GTRI-ও বলেছে, MDR ছোট ব্যবসায়ী এবং মূল্য-সংবেদনশীল ক্রেতাদের মধ্যে নগদ লেনদেনে ফেরার প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
তবে এর বিপরীত দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্র ও NPCI স্পষ্ট করেছে, MDR সরাসরি গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া হবে না এবং ব্যাংকগুলিকে ব্যবসায়ীদের সেই খরচ ক্রেতার উপর চাপিয়ে না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে ‘UPI আবার সাধারণ মানুষের জন্য paid হয়ে গেল’—এমন সরল ব্যাখ্যা বর্তমান নিয়মের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
এখানেই বিতর্কের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকটি আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী নতুন ব্যবস্থাকে ‘UPI tax’ বলে আখ্যা দিয়ে অভিযোগ করেছেন, এর সুবিধা বিদেশি সংস্থাগুলির কাছেও পৌঁছবে এবং সিদ্ধান্তের পিছনে মার্কিন চাপ রয়েছে। কেন্দ্র এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
UPI-র বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ থাকা সংস্থাগুলির উপস্থিতি অবশ্য বাস্তব। Walmart-backed PhonePe এবং Google Pay বর্তমানে ভারতের UPI বাজারের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছে। Reuters-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ UPI বাজার নিয়ন্ত্রণ করে এবং নতুন MDR কাঠামো থেকে তাদের জন্য নতুন revenue stream তৈরি হতে পারে।
তবে PhonePe-কে সরাসরি ‘বিদেশি সংস্থা’ বলা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। PhonePe-র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও CEO সমীর নিগম সম্প্রতি দাবি করেছেন, সংস্থাটি ভারতীয় কোম্পানি এবং Walmart পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগকারী হিসেবে এসেছে। অন্যদিকে Walmart-এর উল্লেখযোগ্য মালিকানা রয়েছে—এই তথ্যও প্রকাশ্য।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমেরিকার নতুন রাশিয়া-সংক্রান্ত শুল্ক আইন। মার্কিন আইনে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেওয়া হয়েছে। ভারত, রাশিয়ার অন্যতম বড় তেল ক্রেতা হওয়ায়, এই ব্যবস্থার সম্ভাব্য প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। তবে কতটা শুল্ক এবং ভারতের উপর তা আদৌ প্রয়োগ করা হবে কি না, তা মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে।
ভারত ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, নতুন মার্কিন আইনের সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফলে একদিকে UPI-র মতো দেশীয় ডিজিটাল পরিকাঠামোর আর্থিক মডেল বদলাচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়ার তেল আমদানিকে ঘিরে ভারতের উপর মার্কিন বাণিজ্যিক চাপের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু UPI-তে ০.৪ শতাংশ MDR বসানো নিয়ে নয়। ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে কীভাবে আর্থিক ভাবে টেকসই রাখা হবে, তার খরচ কে বহন করবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চাপের মধ্যেও দেশের জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত স্বার্থ কতটা স্বাধীনভাবে নির্ধারিত হবে—এই তিনটি প্রশ্নই এখন অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে চলে এসেছে।



