জমি কেলেঙ্কারির মামলায় গ্রেফতারের পর থেকেই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়ের নাম ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। এ বার পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা থানায় সুমিত-সহ তিন জনের বিরুদ্ধে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে FIR দায়ের হয়েছে। অভিযোগ, সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় ৯০ জন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে মোট ৬৭ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, চাকরিপ্রতি প্রথমে কয়েক লক্ষ টাকা করে চাওয়া হয়েছিল। যাঁরা টাকা দিতে রাজি হন, তাঁদের সঙ্গে এজেন্টদের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়। প্রথম পর্যায়ে এজেন্টদের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার পর চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আরও অর্থ দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ।
এরপর চাকরিপ্রার্থীদের কলকাতায় ডেকে পাঠানো হয়। গড়বেতা থানায় দায়ের হওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দক্ষিণ কলকাতার লেক রোডের একটি ক্যাফেতে সুমিত রায়ের সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়। সেখানেও প্রার্থীদের নগদ টাকা নিয়ে আসতে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ। ওই সাক্ষাতের সময় আরও টাকা নেওয়া হয় বলেও অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, কয়েক দফায় এই লেনদেনের অঙ্ক ৬৭ লক্ষ টাকায় পৌঁছয়। একটি প্রতিবেদনে প্রথম পর্যায়ে ৯০ জনের কাছ থেকে ২২ লক্ষ টাকা এবং লেক রোডের ক্যাফেতে আরও ৩২ লক্ষ টাকা নেওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি অর্থও পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
শুধু টাকা লেনদেনের অভিযোগ নয়, নিয়োগ প্রক্রিয়ার মতো করে একাধিক ধাপ অনুসরণ করানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ। চাকরিপ্রার্থীদের হাতে OMR শিট দেওয়া হয়েছিল এবং তা পূরণ করে জমা দিতে বলা হয় বলে অভিযোগকারীর দাবি। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মেডিক্যাল পরীক্ষার প্রক্রিয়ার মধ্যেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই তদন্তের একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। যাঁরা টাকা দিয়েছিলেন, তাঁদের আদৌ সরকারি চাকরিতে নিয়োগ হয়েছিল কি না, তাঁদের হাতে দেওয়া নথি বৈধ ছিল কি না এবং এই টাকা লেনদেনের পিছনে আরও কারা ছিলেন—এই বিষয়গুলি তদন্তেই স্পষ্ট হবে। ফলে অভিযোগের প্রতিটি দিক এখনও যাচাইসাপেক্ষ।
সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে এর আগেও পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরা থানায় সরকারি চাকরির নামে প্রতারণার অভিযোগে FIR হয়েছিল। সেই মামলায় চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া এবং সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতির অভিযোগ সামনে এসেছিল।
অন্য দিকে, বর্তমানে সুমিত রায় শালবনি জমি কেলেঙ্কারি মামলায় CID-এর হেফাজতে রয়েছেন। ১০ সেপ্টেম্বর গ্রেফতারের পর ১১ সেপ্টেম্বর পশ্চিম মেদিনীপুরের আদালত তাঁকে আট দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠায়। ১৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে ফের আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে।
শালবনি মামলার তদন্তেও সুমিতের বিরুদ্ধে সরকারি জমির চরিত্র বদল, জাল নথি এবং জমি লেনদেনের সঙ্গে আর্থিক যোগসূত্রের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে CID। সাম্প্রতিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগও আলাদা করে সামনে আসায় তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
তবে গড়বেতার নতুন মামলায় ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। টাকা লেনদেন, চাকরির প্রতিশ্রুতি, OMR শিট এবং মেডিক্যাল পরীক্ষার মতো অভিযোগের নেপথ্যে ঠিক কী ঘটেছিল, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এখন নজর ১৯ সেপ্টেম্বরের আদালত-পর্ব এবং CID ও পুলিশের পরবর্তী তদন্তে।



