অভিষেক শর্মার রেকর্ড গড়া ব্যাটিংয়ের পর বল হাতে দাপট দেখালেন ভারতের বোলাররাও। দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানকে তৃতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ১২৭ রানে হারিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজ ৩-০ ব্যবধানে জিতে নিল ভারত। প্রথমে ব্যাট করে ভারত ২০ ওভারে ৭ উইকেটে ২২১ রান তোলে। জবাবে মাত্র ৯৪ রানে অলআউট হয়ে যায় আফগানিস্তান।
তবে ম্যাচের মূল আকর্ষণ ছিলেন অভিষেক শর্মা। বাঁহাতি ওপেনার মাত্র ৩০ বলে শতরান করে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ভারতের হয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড নিজের নামে করে নেন। একইসঙ্গে টেস্ট খেলিয়ে দেশের কোনও ব্যাটারের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এটিই দ্রুততম শতরান। এর আগে এই রেকর্ড ছিল ৩৩ বলে শতরান করা জিম্বাবোয়ের সিকান্দার রাজা এবং নিউজিল্যান্ডের ফিন অ্যালেনের দখলে।
অভিষেক শেষ পর্যন্ত ৩৪ বলে ১০৮ রান করে ফেরেন। তাঁর ইনিংসে ছিল ৯টি চার এবং ১১টি ছক্কা। মাত্র ১৬ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করার পর আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন তিনি। শতরানে পৌঁছনোর জন্য পরের ১৪ বলে করেন আরও ৫১ রান। তাঁর বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ভারত।
শুধু অভিষেক নন, পাওয়ারপ্লেতেও ইতিহাস তৈরি করে ভারত। অভিষেক এবং সঞ্জু স্যামসনের ওপেনিং জুটি প্রথম ছয় ওভারেই ১০০ রান তুলে দেয়। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ভারতের এটাই সর্বোচ্চ পাওয়ারপ্লে স্কোর। অভিষেক আউট হওয়ার সময় ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ১০ ওভারের আগেই ১৪২ রানে।
অভিষেকের সঙ্গে ওপেনিংয়ে সঞ্জু স্যামসনও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ৩৫ বলে ৫০ রান করেন তিনি। ফলে প্রথম ১০ ওভারেই ভারতের রান কার্যত আকাশ ছোঁয়ার জায়গায় পৌঁছে যায়। মনে হচ্ছিল, ভারত হয়তো ২৪০-২৫০ রানের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। কিন্তু অভিষেক আউট হওয়ার পর ম্যাচের গতিপথ কিছুটা বদলে যায়।
মিডল অর্ডারে প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। তিলক বর্মা মাত্র ২ রান করে রানআউট হন। অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার ২০ বলে ২৯ রান করেন। শিবম দুবে ১০ বলে ১৪ এবং ঈশান কিষান ৮ বলে ১০ রান করেন। নীতীশ কুমার রেড্ডি করেন ১ রান। শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ২২১ রানেই থামে ভারত।
ভারতের ইনিংসের শেষ ১০ ওভারে আসে ৭৯ রান। অর্থাৎ অভিষেকের বিদায়ের পর আফগানিস্তানের বোলাররা রান আটকে রাখতে অনেকটাই সফল হন। এই জায়গাটিই সিরিজ জয়ের পর ভারতীয় দলের জন্য আলোচনার বিষয় হতে পারে। শুরুটা যেমন বিধ্বংসী হয়েছিল, শেষটা তেমন হয়নি।
তবে ২২২ রানের লক্ষ্য নিয়ে ব্যাট করতে নেমে আফগানিস্তান শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায়। ভারতের বোলাররা পাওয়ারপ্লেতেই একের পর এক উইকেট তুলে নেন। রান তোলার গতি তো কমেই, তার সঙ্গে নিয়মিত উইকেট হারাতে থাকে আফগানরা। ফলে বড় রান তাড়া করার লড়াই কার্যত প্রথম দিকেই শেষ হয়ে যায়।
ভারতের হয়ে নীতীশ কুমার রেড্ডি এবং রবি বিষ্ণোই বল হাতে দুরন্ত পারফরম্যান্স করেন। দু’জনেই তিনটি করে উইকেট নেন। তাঁদের সঙ্গে বাকি বোলাররাও নিয়ন্ত্রিত বোলিং করায় আফগানিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ কোনওভাবেই বড় জুটি তৈরি করতে পারেনি। ১৪.১ ওভারে মাত্র ৯৪ রানে অলআউট হয়ে যায় আফগানিস্তান।
ফলে ভারত ম্যাচটি জেতে ১২৭ রানের বিশাল ব্যবধানে। সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচ জেতার পর তৃতীয় ম্যাচেও জয় তুলে নিয়ে আফগানিস্তানকে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করল টিম ইন্ডিয়া। ব্যাট হাতে অভিষেকের রেকর্ড এবং বল হাতে নীতীশ-বিষ্ণোইদের দাপট—দুইয়ের মিশেলেই দিল্লিতে সম্পূর্ণ আধিপত্য দেখাল ভারত।
এই ম্যাচে অভিষেক শর্মার ইনিংস অবশ্য আলাদা করে ইতিহাসে জায়গা করে নিল। ভারতীয় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ৩৫ বলে শতরানের রোহিত শর্মার দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে মাত্র ৩০ বলে শতরান করেছেন তিনি। একইসঙ্গে পূর্ণ সদস্য দেশের ব্যাটারদের মধ্যে দ্রুততম টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক শতরানের নজিরও গড়েছেন।
সিরিজের তিন ম্যাচেই অভিষেকের ব্যাটে ধারাবাহিকতা দেখা গিয়েছে। প্রথম ম্যাচে ৩২ বলে ৮২ রান করার পর পরের ম্যাচে করেন ৩৯ রান। আর সিরিজের শেষ ম্যাচে ৩৪ বলে ১০৮ রানের ঝড় তুলে একাধিক রেকর্ড ভেঙে দিলেন। ফলে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সিরিজ জয়ের অন্যতম বড় নায়ক যে অভিষেক, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
ভারতের জন্য এই সিরিজ যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জায়গা, তেমনই তৃতীয় ম্যাচের শেষের দিকের ব্যাটিং কিছু প্রশ্নও রেখে গেল। ওপেনাররা দ্রুত রান তুললেও মিডল অর্ডার সেই গতি ধরে রাখতে পারেনি। তবে বোলারদের দুরন্ত পারফরম্যান্স সেই ঘাটতি ঢেকে দিয়েছে। অভিষেকের রেকর্ড সেঞ্চুরি এবং ভারতের ৩-০ সিরিজ জয়ের রাত তাই শেষ পর্যন্ত হয়ে থাকল একেবারেই স্মরণীয়।



