নজরবন্দি ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই স্কুলের পাঠ্যসূচিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের (Syama Prasad Mookerjee) জীবন, কর্ম ও অবদান অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের কথা জানাল রাজ্য সরকার। বৃহস্পতিবার নবান্নে শ্যামাপ্রসাদ-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) জানান, শুধু স্কুল নয়, বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও তাঁর জীবন ও আত্মবলিদান পড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে চলতি বছরজুড়ে একাধিক কর্মসূচি নিয়েছে রাজ্য সরকার। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবেই বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ছিল কমিটির প্রথম বৈঠক। বৈঠকে শিক্ষা থেকে শুরু করে গ্রন্থ প্রকাশ এবং স্মৃতি সংরক্ষণ—একাধিক বিষয়ে পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।
নবান্নে বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী জানান, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে স্কুলশিক্ষা দফতরের উদ্যোগে পাঠ্যসূচিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের একটি পৃথক পর্ব যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর জীবন, রাজনৈতিক ভূমিকা, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান এবং আত্মবলিদানের বিভিন্ন দিক পড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শুধু স্কুলের গণ্ডিতেই এই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকছে না। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—সব স্তরের পাঠ্যক্রমে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে পড়াশোনা ও চর্চার সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পাঠ্যসূচির চূড়ান্ত কাঠামো সংশ্লিষ্ট সিলেবাস কমিটি ও শিক্ষা দফতরের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হবে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি বই ইতিমধ্যেই প্রস্তুত হয়েছে। ওই বই প্রকাশের ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদ যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের উদ্যোগ এবং তথাগত রায়ের (Tathagata Roy) প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। রাজ্য সরকারের ইচ্ছা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই বইটি প্রকাশ করা।
এর পাশাপাশি রাজ্যের গ্রন্থাগার দফতরকেও একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনী প্রকাশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্ম নিয়ে বাংলা এবং ইংরেজি—দুই ভাষাতেই বই প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই সেই কাজ শেষ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগের পরিধি শুধু পাঠ্যবই বা গ্রন্থ প্রকাশেই থামছে না। হুগলির জিরাটে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটে সংরক্ষণ ও সংস্কারের কাজও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। ওই এলাকায় থাকা গ্রন্থাগারের মানোন্নয়ন এবং একটি মিউজিয়াম তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
এর আগে শ্যামাপ্রসাদের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, তাঁর জীবন, পশ্চিমবঙ্গ গঠনে ভূমিকা, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। সেই ঘোষণারই পরবর্তী ধাপ হিসেবে এবার পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা সামনে এল।
ইতিহাস ও শিক্ষার পাঠ্যক্রমে কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জায়গা পাওয়া নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ঘিরে বাংলার রাজনীতি, দেশভাগ, জাতীয়তাবাদ এবং হিন্দু মহাসভার রাজনীতির মতো একাধিক ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ রয়েছে। ফলে নতুন পাঠ্যক্রমে তাঁর কোন কোন দিক কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইতিহাসের পাঠ্যবইয়ে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব অবশ্য একেবারে নতুন নয়। জুলাইয়েই মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, তাঁর জীবন, দেশপ্রেম, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে পাঠ্যক্রমে তুলে ধরার ইচ্ছা রয়েছে। সেই সময়ও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব সিলেবাস কমিটির।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের শিক্ষাজীবন ও রাজনৈতিক ভূমিকার মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে।
রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, তাঁর জীবনের এই বিভিন্ন অধ্যায়ই আগামী দিনে পড়ুয়ারা কতটা এবং কোন কাঠামোয় পড়বে, সেটিই এখন দেখার। একই সঙ্গে জিরাটের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, গ্রন্থাগার এবং প্রস্তাবিত মিউজিয়াম ঘিরে সংরক্ষণ প্রকল্পও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
ফলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীর উদ্যোগ এবার পাঠ্যক্রম, গবেষণা, বই প্রকাশ এবং স্মৃতি সংরক্ষণ—চারটি ক্ষেত্রেই বিস্তৃত হতে চলেছে। আগামী শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবইয়ে নতুন অধ্যায় যুক্ত করার পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা এবং কীভাবে কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।



