আরজি করে নির্যাতিতার দেহ সৎকারে অনিয়ম, গ্রেফতার নির্মল ঘোষ! ওড়িশার হোটেল থেকে ধরল পুলিশ

নতুন এফআইআরের পর ওড়িশায় চলে গিয়েছিলেন পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ। টাওয়ার লোকেশন ধরে পুরী লাগোয়া হোটেল থেকে তাঁকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: নতুন এফআইআর দায়েরের পর থেকেই পুলিশের নজরে ছিলেন পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ (Nirmal Ghosh)। বৃহস্পতিবার সকালে ওড়িশার পুরী লাগোয়া একটি হোটেল থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। আরজি করের তরুণী চিকিৎসকের দেহ দ্রুত সৎকারের ঘটনায় নির্মল-সহ তিন জনের বিরুদ্ধে মৃতার বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে খড়দহ থানায় নতুন মামলা দায়ের হয়েছিল।

পুলিশ সূত্রের খবর, এফআইআর দায়ের হওয়ার পরই ওড়িশায় চলে গিয়েছিলেন নির্মল। পুলিশের নজর এড়াতে তিনি নতুন সিমকার্ড ব্যবহার করছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। সেই নম্বরের মাধ্যমে কয়েক জন ঘনিষ্ঠের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সূত্র ধরেই তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য মেলে। মঙ্গলবার মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন থেকে তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান চালানো হয়। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা নাগাদ পুরীর কাছের একটি হোটেলে হানা দিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

এখন নির্মলকে ওড়িশার আদালতে তোলার প্রস্তুতি চলছে। সেখান থেকে ট্রানজিট রিমান্ডে তাঁকে কলকাতায় আনা হতে পারে। এরপর শুক্রবার তাঁকে ব্যারাকপুর আদালতে পেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন মামলায় শ্মশানে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল, কার নির্দেশে এত দ্রুত দাহ করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা কী ছিল—এই বিষয়গুলিই তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসাবাদের কেন্দ্রে থাকতে পারে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের (R G Kar Medical College and Hospital) তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ-খুনের ঘটনার পর তাঁর দেহ পানিহাটির একটি শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মৃতার পরিবারের অভিযোগ, স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মেনে শেষকৃত্য না করে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে দেহ দাহ করা হয়েছিল। এই ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগও তুলেছে পরিবার।

নতুন এফআইআরে নির্মল ঘোষের পাশাপাশি সোমনাথ দে (Somnath Dey) এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের নাম রয়েছে। মৃতার বাবার অভিযোগ, তাঁদের ভূমিকার কারণেই দেহ দ্রুত সৎকারের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের সম্ভাবনা যাতে না থাকে, সেই উদ্দেশ্যেই তাড়াহুড়ো করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বলে জানা যাচ্ছে। তবে এই অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

এই মামলাকে ঘিরে আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, শ্মশানে অপেক্ষমাণ অন্যান্য দেহের তুলনায় আরজি করের তরুণী চিকিৎসকের দেহ আগে দাহ করা হয়েছিল। দাহের খরচ মকুব এবং প্রয়োজনীয় নথিতে পরিবারের সদস্যদের স্বাক্ষর ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এই বিষয়গুলি নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পরই নতুন করে পুলিশি তৎপরতা শুরু হয়।

সেই নির্দেশের পর মৃতার বাবা খড়দহ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে তিন জনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়। এই নতুন তদন্তটি আরজি করের মূল ধর্ষণ-খুনের তদন্তের থেকে পৃথক একটি দিক—অর্থাৎ মৃত্যুর পর দেহ সৎকারের সময় কী ঘটেছিল এবং সেখানে কোনও বেআইনি হস্তক্ষেপ হয়েছিল কি না—তা খতিয়ে দেখছে। মূল ধর্ষণ-খুনের তদন্ত অবশ্য সিবিআই (CBI)-এর হাতে রয়েছে।

নির্মল ঘোষের গ্রেফতারির সঙ্গে তাঁর ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকে ঘিরে সাম্প্রতিক পুলিশি পদক্ষেপের প্রসঙ্গও সামনে আসছে। জুলাইয়ে পানিহাটির তৃণমূল প্রার্থী তীর্থঙ্করকে দক্ষিণেশ্বর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ভোট-পরবর্তী হিংসা, তোলাবাজি, হুমকি এবং লটারির পুরস্কারের টিকিট ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ-সহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছিল।

তীর্থঙ্করের গ্রেফতারির পরই নির্মল ঘোষের বিরুদ্ধেও পুলিশের তৎপরতা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল। এমনকি জুলাইয়ে নির্মল আগাম সুরক্ষা চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টে (Calcutta High Court) গিয়েছিলেন বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময় তিনি তৃণমূলের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee)-ঘনিষ্ঠ একটি বৈঠকেও দেখা দিয়েছিলেন। যদিও সংশ্লিষ্ট শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তাঁকে বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এবং তিনি নিজেই সেখানে এসেছিলেন।

পানিহাটির রাজনীতিতে নির্মল ঘোষ দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালে তিনি পরপর তিন বার এই কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের বিধায়ক নির্বাচিত হন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হননি; তাঁর ছেলে তীর্থঙ্করকে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। সেই নির্বাচনে পানিহাটিতে বিজেপির প্রার্থী এবং আরজি করের নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথের (Ratna Debnath) কাছে তীর্থঙ্কর পরাজিত হন।

নির্মল ঘোষের গ্রেফতারি তাই শুধু একটি পুরনো ঘটনার তদন্তে নতুন পদক্ষেপ নয়, আরজি কর-কাণ্ডের পর মৃতার দেহ সৎকারের প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা একাধিক প্রশ্নেরও নতুন করে তদন্তের দরজা খুলে দিল। এখন তদন্তকারীদের সামনে মূল প্রশ্ন—সেদিন শ্মশানে কারা উপস্থিত ছিলেন, কী সিদ্ধান্তে দাহকার্য তড়িঘড়ি করা হয়েছিল এবং অভিযোগের পিছনে বাস্তবে কোনও বেআইনি হস্তক্ষেপ ছিল কি না। সেই প্রশ্নের উত্তরই পরবর্তী তদন্ত ও আদালত প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন