বর্ষা এলেই দেখা যায় উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় টানা বৃষ্টি, নদীর জলস্তর বৃদ্ধি এবং অনেক ক্ষেত্রে বন্যার পরিস্থিতি। অথচ একই সময়ে দক্ষিণবঙ্গের অনেক জায়গায় বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, উত্তরবঙ্গে বেশি বৃষ্টি কেন হয়? এর পিছনে রয়েছে ভৌগোলিক অবস্থান, হিমালয় পর্বতমালা এবং মৌসুমি বায়ুর জটিল সম্পর্ক।
ভারতের আবহাওয়া দফতর (IMD)-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় উত্তরবঙ্গের পার্বত্য ও ডুয়ার্স অঞ্চলে। বিশেষ করে দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার জেলার বহু এলাকা বছরে কয়েক হাজার মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত পায়।
উত্তরবঙ্গে বেশি বৃষ্টি কেন হয়? প্রধান কারণ কী?
উত্তরবঙ্গের অতিবৃষ্টির পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হল হিমালয় পর্বতমালার অবস্থান।
বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র মৌসুমি বায়ু উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে হিমালয়ের পাদদেশে পৌঁছালে বিশাল পর্বতশ্রেণির সামনে বাধা পায়। ফলে বায়ু উপরের দিকে উঠতে বাধ্য হয়।
আবহাওয়াবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Orographic Rainfall বা পার্বত্য বৃষ্টিপাত। উপরে উঠতে থাকা আর্দ্র বায়ু ঠান্ডা হয়ে মেঘে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত ঘটায়।

হিমালয় কীভাবে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়?
হিমালয় শুধু বায়ুর গতি থামায় না, বরং বৃষ্টির জন্য আদর্শ পরিবেশও তৈরি করে।
বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু যখন দার্জিলিং ও ডুয়ার্স অঞ্চলের পাহাড়ি ঢালে আঘাত করে, তখন দ্রুত মেঘ তৈরি হয়। এই মেঘ থেকে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টি চলতে পারে।
এই কারণেই উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকা এবং সংলগ্ন সমভূমি অঞ্চলে বর্ষাকালে প্রায় প্রতিদিন বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে।
ডুয়ার্স ও তরাই অঞ্চলে এত বৃষ্টি হয় কেন?
ডুয়ার্স এবং তরাই অঞ্চল হিমালয়ের একেবারে পাদদেশে অবস্থিত।
এখানে আর্দ্র বায়ু সরাসরি পাহাড়ের সঙ্গে সংঘর্ষে আসে। ফলে মেঘের ঘনত্ব দ্রুত বাড়ে এবং ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়।
আলিপুরদুয়ার, হাসিমারা, মালবাজার, নাগরাকাটা এবং বক্সা অঞ্চলে বর্ষাকালে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১০০-২০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টির ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।
মৌসুমি বায়ুর ভূমিকা কতটা?
উত্তরবঙ্গে বৃষ্টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু।
জুন মাসে মৌসুমি বায়ু সাধারণত প্রথমে উত্তরবঙ্গে প্রবেশ করে। বঙ্গোপসাগর শাখার এই বায়ু প্রচুর জলীয় বাষ্প বহন করে আনে।
বর্ষার পুরো সময়জুড়েই এই আর্দ্র বায়ু উত্তরবঙ্গে সক্রিয় থাকে। ফলে সেখানে বৃষ্টিপাতের হার দক্ষিণবঙ্গের তুলনায় অনেক বেশি হয়।
নিম্নচাপ এবং ঘূর্ণাবর্তের প্রভাব
বঙ্গোপসাগরে তৈরি নিম্নচাপ বা ঘূর্ণাবর্ত উত্তরবঙ্গে অতিবৃষ্টির অন্যতম কারণ।
অনেক সময় নিম্নচাপ ঝাড়খণ্ড, বিহার বা উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে অগ্রসর হলে তার প্রভাবে উত্তরবঙ্গে টানা কয়েকদিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হয়।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, মহানন্দা ও রায়ডাক নদীর জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

উত্তরবঙ্গে বন্যা বেশি হয় কেন?
উত্তরবঙ্গে বেশি বৃষ্টির সরাসরি প্রভাব পড়ে নদীগুলির উপর।
হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলি পাহাড়ি এলাকায় দ্রুত গতিতে প্রবাহিত হয়। ভারী বৃষ্টির ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই নদীর জলস্তর বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে যায়।
ফলে ডুয়ার্স, কোচবিহার এবং মালদহের কিছু এলাকায় প্রায় প্রতি বছর বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কোনও প্রভাব আছে?
আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তরবঙ্গে বৃষ্টির ধরন বদলাচ্ছে।
আগে দীর্ঘ সময় ধরে মাঝারি বৃষ্টি হলেও বর্তমানে স্বল্প সময়ের মধ্যে অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে। ফলে ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা এবং নদীভাঙনের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দক্ষিণবঙ্গে একই সময়ে কম বৃষ্টি কেন হয়?
অনেক সময় মৌসুমি অক্ষরেখা (Monsoon Trough) উত্তর দিকে অবস্থান করলে উত্তরবঙ্গে বৃষ্টি বাড়ে এবং দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির পরিমাণ কমে যায়।
আবার কখনও নিম্নচাপের অবস্থান এবং বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে উত্তরবঙ্গ ভারী বৃষ্টি পেলেও কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অংশ তুলনামূলক শুষ্ক থাকতে পারে।
উত্তরবঙ্গে বেশি বৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ হল হিমালয় পর্বতমালার অবস্থান, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র মৌসুমি বায়ু এবং পার্বত্য বৃষ্টিপাতের প্রক্রিয়া। এই তিনটি উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবে দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ারের মতো জেলাগুলি পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
সম্পর্কিত প্রতিবেদন



