গ্রীষ্ম বা বর্ষার বিকেলে দক্ষিণবঙ্গের আকাশে হঠাৎ কালো মেঘ, বিদ্যুতের ঝলকানি আর বজ্রধ্বনি এখন প্রায় পরিচিত দৃশ্য। প্রতি বছর বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনাও সামনে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হল, দক্ষিণবঙ্গে বেশি বজ্রপাত কেন হয়? কেন কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ বা নদিয়ার মতো জেলাগুলি বারবার বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়?
আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরের আর্দ্র বায়ু, তীব্র গরম, কালবৈশাখীর অনুকূল পরিবেশ এবং জলবায়ুগত অবস্থান—এই চারটি কারণ মিলেই দক্ষিণবঙ্গকে দেশের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত করেছে।
বজ্রপাত আসলে কী?
বজ্রপাত বা Lightning হল মেঘের ভিতরে কিংবা মেঘ ও ভূমির মধ্যে সৃষ্ট বিশাল বৈদ্যুতিক নির্গমন।
বজ্রঝড়ের সময় মেঘের মধ্যে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ জমা হতে থাকে। যখন এই চার্জের পার্থক্য অত্যন্ত বেড়ে যায়, তখন বিদ্যুৎ চমকের আকারে নির্গত হয়। এটিই বজ্রপাত।
একটি বজ্রপাতের তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার থেকেও বেশি হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন।
দক্ষিণবঙ্গে বেশি বজ্রপাত কেন হয়?
দক্ষিণবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থানই এর সবচেয়ে বড় কারণ।
এই অঞ্চল বঙ্গোপসাগরের খুব কাছাকাছি। ফলে প্রায় সারা বছরই বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প থাকে। গ্রীষ্মকালে তীব্র গরমের কারণে ভূমির কাছের বায়ু দ্রুত উত্তপ্ত হয় এবং উপরের দিকে উঠতে শুরু করে।
এই উষ্ণ বায়ু যখন আর্দ্রতার সঙ্গে মিশে যায়, তখন বিশাল কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হয়। এই মেঘই বজ্রপাতের মূল উৎস।

বঙ্গোপসাগরের আর্দ্রতা কীভাবে ভূমিকা রাখে?
বঙ্গোপসাগর দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ার অন্যতম নিয়ামক।
সাগর থেকে আসা আর্দ্র বায়ু বায়ুমণ্ডলে প্রচুর জলীয় বাষ্প সরবরাহ করে। এই আর্দ্রতা বজ্রঝড় তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জোগায়।
যত বেশি আর্দ্রতা থাকবে, তত বেশি শক্তিশালী বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে বজ্রপাতের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
কালবৈশাখীর সঙ্গে বজ্রপাতের সম্পর্ক কী?
দক্ষিণবঙ্গে বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ কালবৈশাখী।
মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে যে তীব্র Thunderstorm বা কালবৈশাখী তৈরি হয়, তার সঙ্গে প্রায় সবসময়ই বজ্রপাত জড়িত থাকে।
গরম ও আর্দ্র বায়ুর সংঘর্ষে তৈরি এই ঝড়ের মেঘে প্রচুর বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়। তাই কালবৈশাখীর সময় বজ্রপাতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
কোন কোন জেলায় বজ্রপাত বেশি হয়?
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী দক্ষিণবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলা বজ্রপাতপ্রবণ হিসেবে পরিচিত।
এর মধ্যে রয়েছে—
- মুর্শিদাবাদ
- পূর্ব বর্ধমান
- পশ্চিম বর্ধমান
- নদিয়া
- হুগলি
- হাওড়া
- উত্তর ২৪ পরগনা
- দক্ষিণ ২৪ পরগনা
- পূর্ব মেদিনীপুর
- পশ্চিম মেদিনীপুর
খোলা মাঠ, কৃষিজমি এবং নদী সংলগ্ন এলাকায় বজ্রপাতের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।
গরম বাড়লে কি বজ্রপাতও বাড়ে?
অনেক ক্ষেত্রে উত্তর হল হ্যাঁ।
তাপমাত্রা যত বেশি হয়, ভূমি থেকে উষ্ণ বায়ুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহও তত শক্তিশালী হয়। এর ফলে বজ্রগর্ভ মেঘ দ্রুত তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই এপ্রিল ও মে মাসে দক্ষিণবঙ্গে বজ্রপাতের ঘটনা সবচেয়ে বেশি রেকর্ড করা হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আছে কি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে।
বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার পরিবর্তনের ফলে অনেক ক্ষেত্রে বজ্রঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বজ্রপাতের সংখ্যাও কিছু অঞ্চলে বেড়েছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
বজ্রপাতের সময় কী করবেন?
বজ্রপাত শুরু হলে খোলা মাঠ, ছাদ, নদী বা পুকুরের কাছ থেকে দ্রুত সরে যেতে হবে।
গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বিপজ্জনক। মোবাইল চার্জার, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকা উচিত।
আবহাওয়া দফতরের Thunderstorm বা Lightning Alert দেখলে আগেভাগেই নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়।
কেন দক্ষিণবঙ্গ বজ্রপাতের হটস্পট?
দক্ষিণবঙ্গে বেশি বজ্রপাত হওয়ার পিছনে কোনও একক কারণ নেই। বঙ্গোপসাগরের আর্দ্রতা, তীব্র গরম, কালবৈশাখীর অনুকূল পরিবেশ, বিস্তীর্ণ সমতলভূমি এবং মৌসুমি আবহাওয়ার বৈশিষ্ট্য—সবকিছু মিলিয়েই এই অঞ্চলকে বজ্রপাতপ্রবণ করে তুলেছে। তাই গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে বজ্রপাত সংক্রান্ত সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
সম্পর্কিত প্রতিবেদন
- বজ্রপাত কেন হয়? আকাশে বিদ্যুৎ চমকানোর বৈজ্ঞানিক কারণ জানুন
- বজ্রপাত থেকে বাঁচার উপায়: প্রাণ রক্ষায় জেনে রাখুন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নির্দেশিকা
- বজ্রপাত হলে কী করবেন? প্রাণ বাঁচাতে জেনে রাখুন জরুরি ১০ করণীয়
- Red Alert মানে কী? লাল সতর্কতা জারি হলে কতটা বিপদ, কী করবেন সাধারণ মানুষ?
- Orange Alert মানে কী? কমলা সতর্কতা জারি হলে কতটা বিপদ, কী করবেন সাধারণ মানুষ?
- Yellow Alert মানে কী? আবহাওয়ার হলুদ সতর্কতা জারি হলে কী করবেন, জানুন বিস্তারিত



