বর্ষাকাল এলেই আকাশে কালো মেঘ জমে, শুরু হয় বজ্রগর্জন আর বিদ্যুতের ঝলকানি। কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন, বজ্রপাত কেন হয়? আকাশে বিদ্যুৎ চমকানোর পিছনে কী বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে? প্রতি বছর বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। তাই শুধু কৌতূহল নয়, নিরাপত্তার কারণেও এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি সম্পর্কে জানা জরুরি।
বিজ্ঞানীদের মতে, মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জের ভারসাম্য নষ্ট হলেই বজ্রপাত ঘটে। এটি প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী বৈদ্যুতিক ঘটনার অন্যতম।
বজ্রপাত কী?
বজ্রপাত হল মেঘের মধ্যে বা মেঘ ও মাটির মধ্যে হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিশাল বৈদ্যুতিক স্রাব।
এই সময় কয়েক কোটি ভোল্ট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হতে পারে। এর ফলে আকাশে তীব্র আলোর ঝলক দেখা যায়, যাকে আমরা বিদ্যুৎ চমকানো বলে থাকি।
বজ্রপাত কেন হয়?
বজ্রঝড়ের সময় মেঘের ভিতরে বরফকণা, জলকণা এবং বায়ুকণার মধ্যে ঘর্ষণ হয়।
এই ঘর্ষণের ফলে মেঘের এক অংশে ধনাত্মক (Positive) এবং অন্য অংশে ঋণাত্মক (Negative) বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হতে থাকে।
যখন চার্জের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি হয়ে যায় এবং বায়ু আর অন্তরকের কাজ করতে পারে না, তখন হঠাৎ চার্জ নির্গত হয়। এই ঘটনাকেই বজ্রপাত বলা হয়।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকায় কেন?
বজ্রপাতের সময় বিদ্যুৎ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়।
এই প্রবল শক্তির কারণে আশপাশের বাতাস মুহূর্তের মধ্যে প্রায় ৩০,০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে যায়। সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার থেকেও এটি বেশি।
এই তাপের কারণে উজ্জ্বল আলোর ঝলক তৈরি হয়, যা আমরা বিদ্যুৎ চমকানো হিসেবে দেখি।
বজ্রের শব্দ কেন হয়?
অনেকেই ভাবেন বজ্রপাত এবং বজ্রধ্বনি একই জিনিস। আসলে তা নয়।
বিদ্যুৎ চমকানোর ফলে আশপাশের বাতাস হঠাৎ প্রসারিত হয় এবং পরে দ্রুত সংকুচিত হয়। এই বিস্ফোরণসদৃশ প্রক্রিয়ার ফলেই সৃষ্টি হয় বজ্রধ্বনি।
আলো শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে চলে বলে আমরা প্রথমে বিদ্যুতের ঝলক দেখি, তারপর বজ্রের শব্দ শুনতে পাই।
বজ্রপাত সাধারণত কোথায় বেশি হয়?
বজ্রপাত সাধারণত হয়—
- কালবৈশাখীর সময়
- বজ্রঝড়ের সময়
- বর্ষাকালে
- উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায়
- খোলা মাঠে
- উঁচু গাছ বা টাওয়ারের কাছে
ভারতের পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশায় বজ্রপাতের ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
মেঘ থেকে মাটিতে বজ্রপাত হয় কীভাবে?
মেঘের নিচের অংশে সাধারণত ঋণাত্মক চার্জ জমা হয়।
এর ফলে মাটির উপর ধনাত্মক চার্জ তৈরি হতে শুরু করে। যখন দুইয়ের মধ্যে বৈদ্যুতিক পার্থক্য অত্যন্ত বেশি হয়ে যায়, তখন বিদ্যুৎ মেঘ থেকে মাটির দিকে প্রবাহিত হয়।
এটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরনের বজ্রপাত।
বজ্রপাত কতটা বিপজ্জনক?
একটি বজ্রপাতের শক্তি এতটাই বেশি যে তা—
- মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে
- গাছ ভেঙে ফেলতে পারে
- বাড়িতে আগুন লাগাতে পারে
- বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নষ্ট করতে পারে
- পশুপাখির ক্ষতি করতে পারে
তাই বজ্রপাতকে কখনও হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।
বজ্রপাতের সময় কী করবেন?
- দ্রুত নিরাপদ ঘরের ভিতরে আশ্রয় নিন
- খোলা মাঠ এড়িয়ে চলুন
- বড় গাছের নিচে দাঁড়াবেন না
- জলাশয় থেকে দূরে থাকুন
- বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার বন্ধ করুন
- মোবাইল চার্জে লাগানো থাকলে ব্যবহার করবেন না

বিজ্ঞানীরা কীভাবে বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেন?
বর্তমানে আবহাওয়া দফতর Doppler Radar, স্যাটেলাইট এবং Lightning Detection Network-এর সাহায্যে বজ্রপাতের সম্ভাবনা পর্যবেক্ষণ করে।
IMD এবং বিভিন্ন আবহাওয়া সংস্থা আগাম সতর্কবার্তাও জারি করে।
বজ্রপাত প্রকৃতির এক বিস্ময়কর কিন্তু বিপজ্জনক ঘটনা। মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হওয়া এবং তার হঠাৎ নির্গমনের ফলেই আকাশে বিদ্যুৎ চমকায় ও বজ্রধ্বনি শোনা যায়। তাই বৈজ্ঞানিক কারণ জানার পাশাপাশি বজ্রপাতের সময় প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলাও অত্যন্ত জরুরি।
সম্পর্কিত প্রতিবেদন



